শিরোনাম

ঢাকা, ১ মে, ২০২৬ (বাসস): সাত বছরের বিরতি শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রথম ফ্লাইটটি কারাকাসে অবতরণ করে।
ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার বামপন্থি নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দুই দেশের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার নতুন ইঙ্গিত হিসেবে এ ঘটনাকে দেখা হচ্ছে।
কারাকাস থেকে এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনভয় এয়ারের পরিচালিত ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২৬ মিনিটে মিয়ামি থেকে ছেড়ে যায়। তিন ঘণ্টারও কম সময়ে ‘ফ্লাইট ৩৫৯৯’ কারাকাসে অবতরণ করে। এর মাধ্যমে কয়েক বছরের উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সঙ্গে ফের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করল।
যাত্রী তালিকায় ওয়াশিংটনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও ছিলেন। তারা ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করতে কারাকাসে গেছেন। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেও এটি ছিল কল্পনার বাইরে। বিমান থেকে নামার সময় অনেককে সেলফি তুলেতে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত দীর্ঘদিনের অবরোধ থেকে ভেনেজুয়েলার বেরিয়ে আসার প্রতীক হিসেবে এই ফ্লাইটকে দেখা হচ্ছে। গত বছরের শেষ দিকে মাদুরোর ওপর মার্কিন চাপের চূড়ান্ত সময়ে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ভেনেজুয়েলা এড়িয়ে চলা শুরু করেছিল। নতুন এ ফ্লাইট দেশটিকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল রুটে পুনরায় যুক্ত হওয়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উদযাপনের অংশ হিসেবে বিমানটি অবতরণের পর কারাকাস বিমানবন্দরে ভেনেজুয়েলার দমকল বিভাগের দুটি গাড়ি পানি ছিটিয়ে সেটিকে স্বাগত জানায়।
ভেনেজুয়েলা বংশোদ্ভূত ট্রাভেল এজেন্ট ইসাবেল পাররা ২০১৮ সালের পর এই প্রথম দেশে ফিরলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন অনেক খুশি। বহু বছর ধরে আমাদের কুরাসাও, ডমিনিকান রিপাবলিক বা বোগোতা হয়ে যেতে হয়েছে। তাই এই সরাসরি ফ্লাইট পাওয়া সত্যিই আনন্দের।’
পাররা জানান, উদ্বোধনী ফ্লাইটে টিকেটের দাম ছিল তিন হাজার ডলার। তবে আগামী ২১ মে থেকে আমেরিকান এয়ারলাইন্স আরেকটি দৈনিক রাউন্ড-ট্রিপ ফ্লাইট চালু করলে ভাড়া দ্রুত কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হিউস্টনের ৬৪ বছর বয়সী আইনজীবী অস্কার ফুয়েন্তেস ছিলেন মিয়ামি ফেরত ফ্লাইটের যাত্রীদের সারিতে। তিনি বললেন, ‘জীবন কত সহজ হয়ে যাবে। আজ রাতে খুব খুশি মনে নিজের বিছানায় ঘুমাতে পারব!’ এর আগে তাকেও ডমিনিকান রিপাবলিক হয়ে যাতায়াত করতে হতো।
ফ্লাইটে পরিবেশন করা হয় ভেনেজুয়েলার বিশেষ খবার— ভুট্টার প্যানকেক ‘কাচাপাস’ এবং চিকেন সালাদ।
মিয়ামি বিমানবন্দরের প্রতিনিধি এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত ফেলিক্স প্লাসেনসিয়া যাত্রীদের বিদায় জানান। অন্যদিকে কারাকাসে তাদের স্বাগত জানান মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জন ব্যারেট।
স্প্যানিশ ভাষায় তিনি বলেন, আজ ওয়াশিংটন ও কারাকাস সম্পর্কের নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হল।
ভেনেজুয়েলা এখন ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।
ভেনেজুয়েলার প্রায় ১২ লাখ নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। বিশ্বে উত্তোলনযোগ্য তেলের সবচেয়ে স্বীকৃত বড় মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। সম্পর্কের এই উষ্ণতা উন্নতিতে দেশটিতে মার্কিন ব্যবসায়িক উপস্থিতি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলানদের সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অপরাধপ্রবণ দেশটিতে ফেরত পাঠানো থেকে অভিবাসীদের রক্ষার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি কারাকাসে এক অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। ওই অভিযানে দীর্ঘদিনের মার্কিন বিরোধী নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। এরপর মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন মাদুরো দম্পতি।
দেশটিতে মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রুদ্রিগেজ। আদর্শগত ভিন্নতা সত্ত্বেও তিনি মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতার পথে হেঁটেছেন।
ট্রাম্প মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে সহিংসতার হুমকি দিয়ে শর্ত মানতে চাপও দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলা তেল ও খনি খাত বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য খুলে দিয়েছে।
পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে শুরু করেছেন।
এমনকি রুদ্রিগেজের ওপর থেকেও ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
টেক্সাসভিত্তিক আমেরিকান এয়ারলাইন্স লাতিন আমেরিকায় ব্যাপক নেটওয়ার্কের জন্য পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৭ সালে ভেনেজুয়েলায় ফ্লাইট শুরু করে এবং দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহন করেছে।
২০১৯ সালে সম্পর্কের অবনতি হলে তারা ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মাদুরোকে বৈধ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
ব্যাপক অপরাধের কারণে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এখনও ভেনেজুয়েলা ভ্রমণে নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে। তবে গত মার্চে সব ধরনের ভ্রমণবিরোধী সাধারণ সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান হামলার পর তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বিমান খাত চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেই নতুন এ ফ্লাইট চালু হল।