শিরোনাম

ঢাকা, ১ মে, ২০২৬ (বাসস): হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের নৌপথের মানচিত্র বদলে যাচ্ছে। সমুদ্র ও পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন বিশ্বজুড়ে কন্টেইনারবাহী জাহাজের যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে আফ্রিকা।
গত দুই মাস ধরে চলা এই অবরোধের ফলে জাহাজ মালিকরা বিকল্প পথে স্থলভাগ ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। সমুদ্রপথে উপসাগরীয় দেশগুলোর উপকূলে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় এখন ট্রাকের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য ও শিল্পপণ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে পণ্য পৌঁছানোর বিকল্প পথ
লোহিত সাগরের তীরে সৌদি আরবের জেদ্দা বন্দর এখন নতুন আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এমএসসি, সিএমএ সিজিএম, মার্স্ক এবং কসকো’র মতো বড় বড় কোম্পানির জাহাজগুলো সুয়েজ খাল হয়ে এখন জেদ্দায় ভিড়ছে।
সেখান থেকে মরুভূমির মহাসড়ক দিয়ে ট্রাকযোগে পণ্য যাচ্ছে শারজাহ, বাহরাইন ও কুয়েতে। গত দুই মাস ধরে এই দেশগুলোতে সমুদ্রপথে কোনো পণ্য পৌঁছাতে পারছে না।
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ‘ওভারসি’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা আর্থার বারিলাস ডি দ্য বলেন, ‘জেদ্দা বন্দর এত বিশাল পরিমাণ আমদানি সামাল দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল না। ফলে সেখানে এখন তীব্র জাহাজ জট তৈরি হচ্ছে।’
কেপলার মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার জেদ্দায় ১১টি কন্টেইনারবাহী জাহাজ নোঙর করেছিল এবং আরও ৯টি অপেক্ষায় ছিল। জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে এখন গড়ে ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগছে, যা গত সপ্তাহে ছিল মাত্র ১৭ ঘণ্টা।
জাহাজ মালিকরা জানিয়েছেন, তারা হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমানের সোহর এবং আরব আমিরাতের খোরফাক্কান ও ফুজাইরা বন্দর ব্যবহার করবেন। এই বন্দরগুলো স্থলপথে সংযুক্ত। অন্যদিকে জর্ডানের আকাবা বন্দর দিয়ে ইরাকের বাগদাদ ও বসরায় পণ্য পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া তুরস্কের একটি করিডোর ব্যবহার করে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে পণ্য সরবরাহ চলছে।
কেন সুয়েজ খাল এড়িয়ে চলছে জাহাজ?
লোহিত সাগর এড়িয়ে চলার প্রবণতা শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে। ওই সময় ইয়েমেন উপকূল থেকে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা প্রথম একটি কন্টেইনারবাহী জাহাজে হামলা চালায়। পণ্য পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকা ঘুরে যাতায়াত করাটা একটি নিয়মিত বিষয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাহাজগুলো এখন আফ্রিকার পূর্ব উপকূল দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ বা উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগর অভিমুখে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোহিত সাগর দিয়ে বিগত বছরগুলোতে যে পরিমাণ বাণিজ্য হতো, তার ৭০ শতাংশই এখন উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পোর্টওয়াচ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত তিন গুণ বেড়েছে। বিপরীতে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে যাতায়াত অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। গত বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে এই পথে প্রতিদিন গড়ে ১৮টি জাহাজ চলত, যা এখন মাত্র ৫টিতে নেমে এসেছে।
পরিবর্তনের প্রভাব
নৌপথ বদলে যাওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সময় গড়ে দুই সপ্তাহ বেড়ে গেছে।
ড্রিউরি ফ্রেইট সূচকের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত জ্বালানি এবং জাহাজ লাগায় খরচও বেড়েছে ব্যাপক। গত বছরের তুলনায় এপ্রিলে একটি কন্টেইনার পরিবহনের খরচ গড়ে ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতির কারণে আফ্রিকার কিছু বন্দরের ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে। মরক্কোর তানজান মেদ বন্দরে গত বছর পণ্য পরিবহন বেড়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে মিসর। সুয়েজ খাল থেকে তাদের টোল আদায় আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে তারা প্রায় ৭০০ কোটি ডলার রাজস্ব হারিয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৬০ শতাংশ কম।