বাসস
  ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২৩

সুদানের যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে লাশ সামলানোর লড়াই

ঢাকা, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : খার্তুমের একটি অস্থায়ী মর্গে বসে প্রকৌশলী থেকে দাফনকর্মী হওয়া আলি গেব্বাই মৃতদের একটি স্প্রেডশিটে তথ্য খুঁজে দেখছিলেন।

হাজার হাজার নাম। প্রতিটির সঙ্গে ছবি ও কবরস্থানের তথ্য। সুদানের যুদ্ধের এক ভয়াবহ নথি।

স্বেচ্ছাসেবকদের দল যখনই কোনো লাশ পায়, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি প্রকাশ করে। এরপর ৭২ ঘণ্টা অপেক্ষা করে। 

আশায় থাকে, স্বজনরা দেখে এসে পরিচয় নিশ্চিত করবেন।

খার্তুম থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

গেব্বাই এএফপিকে বলেন, ‘আমরা প্রতিটি লাশের ছবি তুলি। পকেটে কিছু আছে কি না দেখি, যাতে পরিচয় শনাক্ত করা যায়। আর কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেটিও আমরা চিহ্নিত করি।’

এপ্রিলের তপ্ত এক দিনে, সুদানের রাজধানীর ছোট একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে মাটিতে পড়ে ছিল এক নারীর লাশ। 

বাদামি ছোপযুক্ত জোব্বা তার মুখ ও শরীর ঢেকে রেখেছে।

কেউ পরিচয় নিশ্চিত করতে না এলে, দলটি পরিষ্কার সাদা কাফন প্রস্তুত করে। মুসলিম রীতি অনুযায়ী গোসল করিয়ে কাছেই দাফন করে।

খার্তুমে মর্গ বলতে এখন এটুকুই ভরসা।

আর সেটিও অধিকাংশ নিহতের ভাগ্যে জোটে না। অনেককে যেখানে নিহত হন, সেখানেই তড়িঘড়ি করে মাটিতে অগভীর কবর দেওয়া হয়।

সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে চলমান এই সংঘাত এখন চতুর্থ বছরে।
মৃতের সঠিক সংখ্যা নেই। তবে নিহত অন্তত কয়েক হাজার থেকে শুরু করে সহায়তা কর্মীদের হিসাবে ২ লক্ষাধিক হতে পারে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সুদান শাখার উপপ্রধান হোসে লুইস পোসো গিল এএফপিকে বলেন, ‘এতসব অনুমান হতাশাজনক। মানুষ জানেই না যে কী ঘটেছে। এই ট্রমা ও প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না।’

গত এক বছরে সেনাবাহিনী খার্তুম পুনর্দখল করার পর, প্রায় ২৮ হাজার লাশ উত্তোলন করে, পুনরায় দাফন করা হয়েছে বলে জানান দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান হিশাম জেইন আল-আবেদিন।

তবে এখনো রাজধানীর অর্ধেকের কিছু বেশি এলাকা পরিষ্কার করা গেছে।

গেব্বাই বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে, তিনি ও তার দল প্রায় ৭ হাজার লাশ দাফন করেছেন।

অন্যদিকে দারফুরে জাতিগত হত্যাযজ্ঞে একসঙ্গে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।

এ বছরই কেবল কর্দোফানে ড্রোন হামলায় অন্তত ৭০০ জন নিহত হয়েছেন।

-মর্গ ধ্বংস-

দেশজুড়ে লাশ সংরক্ষণের জায়গা নেই। গণনারও উপায় নেই। সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের সময়, মসজিদ ও বাজারে যখন অগ্নিবোমা আঘাত হানে, উদ্ধারকারীরা  তখন প্রায়ই কাফনের কাপড়ের সংকটে পড়ে যান। মৃতদের সেখানেই দাফন করা হয়। নিজের কাপড় বা প্লাস্টিক ব্যাগে জড়িয়ে।

অনেক গ্রামে কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য পাঠানোর মতো মর্গ তো দূরের কথা কোনো ক্লিনিকই নেই।জেইন আল-আবেদিন বলেন, খার্তুমের মর্গগুলো ‘যুদ্ধের আগেই পূর্ণ ছিল।’

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির তথ্য অনুযায়ী, খার্তুমের চারটি মর্গই যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়ে। তবে ভেতরে লাশ রয়ে যায়।

জেইন আল-আবেদিন জানান, হামলায় ওমদুরমান মর্গ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। কমপ্রেসর লুট হয়ে যায়। চারদিকে পচতে থাকা লাশ পড়ে ছিল।

তার দল এক বছর ধরে খার্তুমের লাশ উত্তোলন করছে।

তাদের লক্ষ্য—অগভীর কবর, জনসমাগমস্থল, নর্দমা ও নীল নদের তীর থেকে লাশ উদ্ধার করা।

গুলি চলা আর গোলাবর্ষণের মধ্যে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেনি। পাশের রাস্তায় যাওয়া তো দূরের কথা, কবরস্থানে পৌঁছানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ফলে মানুষ নিজেদের উঠান, খেলার মাঠ ও রাস্তার মোড়ে স্বজনদের দাফন করে।

তিন বছরে খার্তুম এক খোলা কবরস্থানে পরিণত হয়েছে।

জেইন আল-আবেদিন বলেন, ‘এটি সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। মানবিক মর্যাদা নষ্ট করে। মৃত্যু যেন স্বাভাবিক হয়ে যায়।’

একই চিত্র গোটা সুদানজুড়ে। দারফুরে, স্যাটেলাইট ছবিতে রক্তের দাগ দেখা গেছে আর কর্দোফানে এখনো ড্রোন হামলায় সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছেন।