শিরোনাম

ঢাকা, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের প্রেক্ষাপটে ইরান শনিবার আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে বলে দেশটির সামরিক কমান্ড জানিয়েছে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রণালিটি খুলে দেওয়া হয়েছিল এবং তখন এক ডজনেরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অতিক্রম করছিল।
প্রণালী খোলা ও বন্ধ নিয়ে এই দোলাচল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের দিনের সেই আশাবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের অবসানে একটি শান্তিচুক্তি ‘খুব কাছাকাছি’।
তেহরান থেকে এএফপি জানায়, শুক্রবার লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সাধারণত বিশ্বে মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই ঘোষণায় বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং তেলের দাম কমে যায়। তবে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-অবরোধ চালিয়ে যাবে। এর প্রেক্ষিতে তেহরান আবার প্রণালী বন্ধের হুমকি দেয়।
শনিবার সকাল দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ডের বরাত দিয়ে জানায়, ‘হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে গেছে’ এবং এটি এখন ‘সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর তত্ত্বাবধানে’ রয়েছে।
এদিকে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটগুলোর তথ্যে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি জাহাজ দ্রুতগতিতে সরু এই জলপথ পার হওয়ার চেষ্টা করছে। অনেক জাহাজ ইরানের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশটির জলসীমার কাছাকাছি দিয়ে চলাচল করছে এবং নিজেদের পরিচয় ভারতীয় বা চীনা হিসেবে প্রচার করছে, যাতে নিরপেক্ষতা বোঝানো যায়।
শুক্রবার রাতেও কিছু জাহাজ হরমুজের দিকে রওনা দিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আবার ফিরে যায়।
শনিবার (০৯০০ জিএমটি) পর্যন্ত কয়েকটি জাহাজ উভয় দিকেই প্রণালী অতিক্রম করেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে ভারতের দিকে যাওয়া অন্তত দুটি তেলবাহী জাহাজ মাঝপথে ফিরে গেছে।
‘আমরা এটা পাবই’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিরতির দুই সপ্তাহের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র চার দিন বাকি রয়েছে। তবুও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তিনি শুক্রবারকে ‘চমৎকার ও অসাধারণ’ দিন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রশংসা করেন।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তিন দিনের ইরান সফর শেষে শনিবার দেশে ফেরেন। সফরকালে তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফর করেন।
এই সংঘাতে ইসলামাবাদ প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সের উপস্থিতিতে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
আগামী সপ্তাহে পাকিস্তানের রাজধানীতে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।
এরপর সংঘাত দ্রুত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হামলা চালায় এবং হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালিয়ে লেবাননকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে।
যুদ্ধবিরতি এখনো মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দেশটির আকাশসীমা পুনরায় উন্মুক্ত ঘোষণা করেছে, যার ফলে পূর্বাঞ্চল দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল সম্ভব হচ্ছে।
অমীমাংসিত ইস্যু
তবে শান্তি আলোচনায় দুটি বড় বিষয়- ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ- এখনো অমীমাংসিত।
শুক্রবার এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি,’ এবং দাবি করেন যে কোনো অচলাবস্থা আর নেই।
অ্যারিজোনায় এক অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা খননযন্ত্র নিয়ে গিয়ে এগুলো সংগ্রহ করব।’
তবে কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের ইউরেনিয়ামের মজুত কোথাও স্থানান্তর করা হবে না।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথাও সরানো হবে না’ এবং ‘এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।’
এদিকে, সাধারণ ইরানিরা এখনো আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর আরোপিত ইন্টারনেট বন্ধ ৫০ দিনে পৌঁছেছে।