শিরোনাম

ঢাকা, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস): পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একটি চুক্তি হওয়ার ব্যাপারে তারা আশাবাদী।
তবে একই সময়ে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্দর অবরোধ তুলে না নিলে, লোহিত সাগরের বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
বুধবার সকালে একটি পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছায়। তারা ওয়াশিংটনের নতুন বার্তা নিয়ে যায়।
গত সপ্তাহের শেষে ইসলামাবাদে দু’পক্ষের আলোচনা ভেস্তে যায়। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহেই আলোচনা আবার শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, পরবর্তী আলোচনা খুব সম্ভবত পাকিস্তানের রাজধানীতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই আলোচনা চলছে ও চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আমরা ইতিবাচক অনুভব করছি।’
প্রথম দফার আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের অবসান ও তেহরানের বহু পুরোনো পারমাণবিক বিরোধ মেটাতে ইরানকে একটি ‘গ্র্যান্ড বার্গেন’ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্য একই।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানো হোক। দেশটির ভেতরে সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ হোক এবং অবশ্যই হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হোক।’
চুক্তির সম্ভাবনায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। শেয়ারবাজারে উত্থান হয়, অপরিশোধিত তেলের দাম কমে। কারণ, প্রণালীটি আবার চালু হলে তেল পরিবহন স্বাভাবিক হবে— এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হামলা শুরু করার পর থেকে ইরান সেখানে চলাচল সীমিত করে রেখেছে।
—‘শেষের পথে’ যুদ্ধ-
ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে তাদের বন্দর অবরোধ জোরদার করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, তারা ‘সমুদ্রপথে ইরানের সব ধরনের বাণিজ্য কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।’
তবে হরমুজ প্রণালীর সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, পরিস্থিতি এতটা স্পষ্ট নয়।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে এখনও জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান আলী আবদোল্লাহি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অবরোধ না তোলে, তাহলে তা ৮ এপ্রিল হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সূচনা হবে।
তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটন যদি পিছু না হটে, তাহলে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরে কোনো আমদানি-রপ্তানি চলতে দেওয়া হবে না।’
মঙ্গলবার নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আগামী দুই দিনের মধ্যে’ পাকিস্তানে নতুন দফা আলোচনা হতে পারে।
ফক্স বিজনেসকে তিনি বলেন, যুদ্ধ ‘শেষের খুব কাছাকাছি।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, আলোচনা শেষ হওয়ার পর থেকে ইসলামাবাদের মাধ্যমে ‘একাধিক বার্তা’ আদান-প্রদান করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বুধবার তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে আসা প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানান।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বার্তা পৌঁছে দেওয়া ও দ্বিতীয় দফা আলোচনা নিয়ে কথা বলবে।
-‘গ্র্যান্ড বার্গেন’ প্রস্তাব-
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, যে কোনো চুক্তিতে ইরানকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত থাকতে হবে। তিনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করেন। তার দাবি ছিল, তেহরান দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে এগোচ্ছে— যদিও জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা এই দাবি সমর্থন করেনি।
খবরে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের প্রস্তাব দেয়। এর জবাবে ইরান পাঁচ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিতের প্রস্তাব দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করে।
তেহরান বরাবরই বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার জানায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ‘অবিসংবাদিত’, তবে এর মাত্রা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ভ্যান্স বলেন, ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন— ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার অঙ্গীকার করে, তাহলে তাকে ‘সমৃদ্ধশালী দেশ’ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করা হবে।
তিনি বলেন, ‘এটাই প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ট্রাম্পীয় গ্র্যান্ড বার্গেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব এবং এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।’
-লেবানন নিয়েও আলোচনা-
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার এই অগ্রগতির মধ্যেই ইসরাইল ও লেবাননও সরাসরি আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। ১৯৯৩ সালের পর প্রথমবারের মতো মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে তাদের উচ্চ পর্যায়ের মুখোমুখি বৈঠক হয়।
নেতানিয়াহু বলেন, লেবানন নিয়ে আলোচনায় দুটি মূল লক্ষ্য— ‘প্রথমত, হিজবুল্লাহকে ভেঙে দেওয়া আর দ্বিতীয়ত, শক্তির ভিত্তিতে টেকসই শান্তি নিশ্চিত করা।’
ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত থামাতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের আশঙ্কা, এই সংঘাত বড় ধরনের সমঝোতাকে ভেস্তে দিতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ‘সব পক্ষই পারস্পরিক সম্মত সময় ও স্থানে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে রাজি হয়েছে।’
তবে পরিস্থিতি এখনও নাজুক। হিজবুল্লাহ আলোচনার বিরোধিতা করে ইসরাইলের দিকে ডজনখানেক রকেট ছোড়ে।
জবাবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ২৪ ঘণ্টায় লেবাননে হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট দুই শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে।
ইসরাইলের সেনাপ্রধান জানান, লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলকে হিজবুল্লাহর জন্য ‘কিল জোন’ বানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানায়, দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় বুধবার অন্তত তিন জন প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন।