শিরোনাম

ঢাকা, ৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস): ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনে পড়েছে। এর মধ্যেই লেবাননে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এর ফলে তেহরানও নতুন করে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার বিষয়ে একমত হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়পক্ষই নিজেদের জয় দাবি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এই যুদ্ধ বন্ধ করাই এই আলোচনার লক্ষ্য।
তবে বুধবারেই এই চুক্তিতে ফাটল দেখা দেয়। মার্চে হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়ানোর পর এটিই ছিল লেবাননে ইসরাইলের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। বৈরুতের জনবহুল এলাকাগুলোও এই হামলার শিকার হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বুধবারের হামলায় অন্তত ১৮২ জন নিহত এবং প্রায় ৯০০ জন আহত হয়েছেন।
ইসরাইল জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের লড়াই মঙ্গলবার রাতে হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির অংশ নয়। একই সুরে কথা বলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। কয়েক দিন পরই পাকিস্তানে ইরানের সাথে আলোচনায় তার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
ভ্যান্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কখনোই লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতির অংশ বলেনি। লেবানন ইস্যুতে ইরান যদি এই আলোচনা ভেস্তে দিতে চায়, তবে সেটি তাদের একান্তই নিজস্ব সিদ্ধান্ত।’
তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুদ্ধবিরতি নিয়ে হুমকি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে তিনি বলেন, আলোচনার ভিত্তি এরই মধ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে। ফলে পরবর্তী আলোচনা এখন ‘অযৌক্তিক’।
গালিবাফ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের তিনটি অভিযোগ তুলেছেন: লেবাননে অব্যাহত হামলা, ইরানি আকাশসীমায় ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার প্রত্যাখ্যান।
যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কার মাঝে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান যে ১০ দফা পরিকল্পনার কথা বলছে, যুদ্ধ বন্ধে হোয়াইট হাউস সেই শর্তগুলোতে রাজি হয়নি।
এদিকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে কোনো সতর্কতা ছাড়াই চালানো এই হামলাকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক।
বৈরুতের কর্নিশ আল-মাজরায় অবস্থানরত আলি ইউনুস বলেন, ‘মানুষ প্রাণভয়ে দিগ্বিদিগ ছুটছিল, চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।’
স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, গত মাসে ইসরাইলের বিমান ও স্থল হামলা শুরুর পর থেকে লেবাননে ১ হাজার ৭০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, ইসরাইল হামলা বন্ধ না করলে তারা পাল্টা জবাব দেবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানায়, তাদেরও প্রতিশোধ নেওয়ার ‘অধিকার’ রয়েছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, প্রয়োজনে তারা ইরানের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণসহ তাদের সামরিক লক্ষ্যগুলো পূরণ হওয়া এখনো বাকি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও জানিয়েছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
পাকিস্তানে শুক্রবার বা শনিবার উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির মুখে ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে রাজি হয়। বুধবার এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলও করেছে।
তবে বিভিন্ন খবরে জানা গেছে, অস্ত্রবিরতি সত্ত্বেও বুধবার শেষ দিকে জলপথটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউস একে 'সম্পূর্ণ অগ্রহণীয়' বলে অভিহিত করেছে।
বৃহস্পতিবার ইরান হরমুজ প্রণালীর বিকল্প রুটের ঘোষণা দিয়েছে। প্রধান নৌ-চলাচল এলাকায় মাইন থাকার ঝুঁকির কথা জানিয়ে তারা এই রুট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সব পক্ষকে ‘সংযত থাকার এবং দুই সপ্তাহের অস্ত্রবিরতি মেনে চলার’ আহ্বান জানান।
যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে আরও সংশয় তৈরি হয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যমের এক ঘোষণায়। সেখানে বলা হয়, ইরানের তেল স্থাপনায় হামলার প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোতে নতুন করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং বাহরাইন হামলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে।
এদিকে তেহরানের রাস্তাঘাট বুধবার ছিল শান্ত। দীর্ঘ উদ্বেগের পর শহরবাসী কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ দেখা গেছে। সকিনা মোহাম্মদী নামের এক গৃহিণী বলেন, ‘সবাই এখন শান্তিতে আছে। আমি আমার দেশের জন্য গর্বিত।’
বুধবার বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের নেতারা বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধের একটি ‘দ্রুত এবং স্থায়ী সমাধান’ নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে পোপ লিও এই মুহূর্তটিকে ‘প্রকৃত আশা’র আলো হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো এখনো পুরোপুরি বিপরীতমুখী। এই সরু জলপথটি দিয়েই বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতেই তারা দেশটিতে এই হামলা চালিয়েছে।
কয়েক সপ্তাহের অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২০ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন ট্রাম্প। সংঘাতের সময় তারা কোনো সাহায্য করেনি দাবি করে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনে ‘তারা পাশে থাকবে না’।
বুধবার ওয়াশিংটনে ন্যাটোর প্রধানের সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প সম্ভবত এই সামরিক জোট ত্যাগের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।