বাসস
  ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:০৫

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই: ‘প্রজেক্ট মেভেন’ সম্পর্কে ৫ তথ্য

ঢাকা, ৫ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় মূল ভূমিকা পালন করছে পেন্টাগনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কর্মসূচি ‘প্রজেক্ট মেভেন’। আধুনিক যুদ্ধকৌশলে এটি এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এই বিশেষ প্রোগ্রামটি সম্পর্কে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

১. প্রজেক্ট মেভেন কী?

এটি পেন্টাগনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এআই প্রোগ্রাম। ২০১৭ সালে এটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়। এর মূল কাজ ছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা ড্রোনের হাজার হাজার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা। আগে গোয়েন্দাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখে শত্রু শনাক্ত করতে হতো। মেভেন সেই খড়ের গাদায় সুঁচ খুঁজে বের করার মতো কঠিন কাজটি চোখের পলকে নিখুঁতভাবে করতে পারে। গত আট বছর ধরে এটি আরও উন্নত হয়ে এখন হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও যুদ্ধের ময়দান পরিচালনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

২. এটি কীভাবে কাজ করে?

মেভেন একই সাথে যুদ্ধের ‘এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল’ এবং এর ককপিটের মতো কাজ করে। সিএসআইএস (ঈঝওঝ) ওয়াধওয়ানি এআই সেন্টারের পরিচালক আলোক মেহতা এই ব্যবস্থাটিকে মূলত একটি ‘ওভারলে’ বা সমন্বিত স্তর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য, শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইটের ছবি এবং সৈন্য মোতায়েনের সব তথ্যকে এক জায়গায় একীভূত করে।

ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো- এটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে স্যাটেলাইট ছবিগুলো স্ক্যান করে সৈন্যের অবস্থান বা লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি এটি পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের একটি সামগ্রিক চিত্র (স্ন্যাপশট) তুলে ধরে, যাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সেরা উপায়টি নির্ধারণ করা যায়। 

সম্প্রতি অনলাইনে প্রকাশিত একটি প্রদর্শনীতে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানান, মেভেন কীভাবে ‘জাদুর মতো’ কোনো হুমকি শনাক্ত করে তা ধ্বংস করার জন্য কমান্ডারের সামনে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব পেশ করে।

চ্যাটজিপিটি’র উদ্ভাবন এই প্রযুক্তিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এর ফলে এখন অনেক বেশি ব্যবহারকারী সাধারণ ভাষায় কথা বলার মাধ্যমেই মেভেনের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন। বর্তমানে এই সুবিধা দিচ্ছে অ্যানথ্রোপিক-এর ‘ক্লাউড’। 

তবে ক্লাউডের সঙ্গে পেন্টাগনের এই সম্পর্কের অবসান ঘটতে চলেছে। কারণ, তারা চায়, তাদের মডেলটি যেন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হামলা বা মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহার না করা হয়। পেন্টাগন তাদের এই শর্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
৩. গুগল কেন সরে দাঁড়িয়েছিল?

শুরুতে গুগল এই প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে গুগলের ৩ হাজারের বেশি কর্মী এই সামরিক প্রকল্পে কাজ করার প্রতিবাদে একটি খোলা চিঠিতে সই করেন।

নৈতিক কারণে বেশ কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার পদত্যাগও করেন। এরপর গুগল তাদের চুক্তি আর নবায়ন করেনি এবং নীতি গ্রহণ করে যে তারা কোনো মারণাস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে না। তবে সম্প্রতি গুগল তাদের সেই নীতি শিথিল করেছে। বর্তমানে ক্লাউড-এর পরিবর্তে গুগল, ওপেনএআই বা এক্সএআই এই প্রোগ্রামে যুক্ত হতে পারে।
৪. পালানটির-এর ভূমিকা কী?

২০২৪ সালে গুগলের ছেড়ে যাওয়া শূন্যস্থানে স্থলাভিষিক্ত হয় ‘পালানটির’। সিআইএ-এর প্রাথমিক অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই সরকারি গোয়েন্দা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। বর্তমানে তারাই মেভেন-এর মূল প্রযুক্তিগত ঠিকাদার এবং এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি।

পালানটির-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অ্যালেক্স কার্প এই প্রযুক্তির গুরুত্ব সরাসরি তুলে ধরেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এটি এমন এক পৃথিবী যেখানে কারো কাছে সক্ষমতা থাকবে, আবার কারো থাকবে না।’ তিনি যুক্তি দেখান যে, বাকি বিশ্ব যা করতে পারছে না, পশ্চিমা বিশ্বের সেই সক্ষমতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।

কার্পের মতে, যে প্রযুক্তি শত্রুকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করার সময়কে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক সেকেন্ডে নামিয়ে আনে, তার সামনে প্রতিপক্ষ টিকতে পারবে না।
৫. যুদ্ধে এটি কতটা সফল?

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে মেভেন-এর ফলাফল কেমন, সে বিষয়ে পেন্টাগন সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মার্কিন হামলার তীব্রতা ও গতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, মেভেন-এর কারণেই এত দ্রুত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও হামলা চালানো সম্ভব হচ্ছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী ১ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তবে গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এসব হামলায় একটি স্কুলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা আগে সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতো। ইরান দাবি করেছে, ওই হামলায় ১৬৮ শিশু নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছে।