শিরোনাম

ঢাকা, ৩১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুযোগ রেখে একটি বিল সোমবার অনুমোদন করেছে ইসরাইল পার্লামেন্ট।
সমালোচকরা একে বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে এর বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জও করা হয়েছে। জেরুজালেম থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ ৬২ জন আইনপ্রণেতা বিলটির পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন ৪৮ জন। বিলটি উত্থাপন করেন কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির।
একজন ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন। বাকিরা উপস্থিত ছিলেন না।
ভোটের আগে বেন গিভির গলায় ফাঁসির প্রতীকযুক্ত একটি ব্যাজ পরেন, যা এই আইনের প্রতি তার সমর্থনের প্রতীক।
ভোটের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেন, ‘আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছি!!! আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমরা তা বাস্তবায়ন করেছি।’
বিল অনুযায়ী, ইসরাইলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সামরিক আদালতে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচিত প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী ফলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড হবে ডিফল্ট শাস্তি।
তবে ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ এই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা যেতে পারে বলে বিলটিতে উল্লেখ আছে।
পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসরাইলি সামরিক আদালতে বিচার করা হয়।
ইউরোপ কাউন্সিল বলেছে, এই আইন অনুমোদন ‘গুরুতর পশ্চাৎপদতার’ ইঙ্গিত বহন করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সোমবার বলেছে, তারা ‘সন্ত্রাসবাদে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য নিজস্ব আইন ও শাস্তি নির্ধারণে ইসরায়েলের সার্বভৌম অধিকারকে সম্মান করে।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা আশা করি, এ ধরনের যে কোনো ব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এবং প্রযোজ্য সব আইনি সুরক্ষা মেনে বাস্তবায়ন করা হবে।’
বিল অনুযায়ী, ইসরাইলের ফৌজদারি আদালতে যে কেউ ‘ইসরাইলের অস্তিত্ব বিলোপের উদ্দেশে কোনো ইসরাইলি নাগরিক বা বাসিন্দাকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রাণনাশ ঘটালে’ তাকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
এই আদালতগুলোতে ইসরাইলি নাগরিকদের বিচার হয়, যার মধ্যে ফিলিস্তিনি নাগরিক ও পূর্ব জেরুজালেমের বাসিন্দারাও রয়েছেন। বিলটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসির কথা বলা হয়েছে।
সাজা ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে তা কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত সময় বাড়ানো যেতে পারে।
- ‘সমান্তরাল ব্যবস্থা’-
বিলটি ইসরাইলের মৌলিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে, যেখানে বৈষম্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ।
বিল পাসের পরপরই একটি শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
ইসরাইলের সিভিল রাইটস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই আইন দুটি সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা মূলত ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রযোজ্য।’
তাদের মতে, ‘পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের বিচারকারী সামরিক আদালতে এটি প্রায় বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে।’
আর বেসামরিক আদালতে আসামিকে ‘ইসরাইলের অস্তিত্ব বিলোপের উদ্দেশ্যে’ কাজ করতে হয়েছে— এমন শর্ত থাকায় ‘গাঠনিকভাবে ইহুদি অপরাধীদের বাইরে রাখা হয়েছে।’
সংস্থাটি বলেছে, এখতিয়ার ও সাংবিধানিক উভয় ভিত্তিতেই আইনটি বাতিল হওয়া উচিত।
আদালাহ সংস্থার আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি সমন্বয়ক মিরিয়াম আজেম বলেন, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যে নির্যাতন বেড়েছে, এই আইন তা আরও বাড়াবে।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে নানা যুক্তি উপস্থাপন করা হবে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনে আদালত অনেকটাই সহনশীলতা দেখিয়েছে।’
‘যদি আদালত এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে তা ইসরায়েলের বিচার ব্যবস্থার অবস্থান স্পষ্ট করে দেবে।’
পার্লামেন্টে বিতর্ক চলাকালে বিরোধী আইন প্রণেতা ও সাবেক মোসাদ উপ-পরিচালক রাম বেন বারাক এই আইনের তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘জুদিয়া ও সামারিয়ায় আরবদের জন্য এক আইন, আর সাধারণ জনগণের জন্য আরেক আইন— এর অর্থ কী, আপনারা কি বুঝতে পারছেন?’
তিনি বলেন, ‘এতে বোঝা যায়, হামাস আমাদের পরাজিত করেছে। আমরা আমাদের সব মূল্যবোধ হারিয়েছি।’
‘বৈষম্যমূলক প্রয়োগ’
বেন গভিরের দলের আইন প্রণেতা লিমোর সন হার-মেলেখ বিলটির পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি এক হামলায় স্বামীকে হারিয়েছেন।
লিমোর বলেন, ‘বছরের পর বছর আমরা সন্ত্রাস, কারাবাস, অদূরদর্শী চুক্তিতে মুক্তি ও আবার হত্যাকাণ্ডে ফিরে আসার এক নিষ্ঠুর চক্র সহ্য করেছি। আজ সেই চক্র পূর্ণতা পেল।’
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই আইন অনুমোদনের নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, ‘ফিলিস্তিনি ভূমির ওপর ইসরাইলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই।’
তাদের ভাষ্য, ‘এই আইন আবারও প্রমাণ করে ইসরাইলি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার প্রকৃতি, যা আইনগত আড়ালে বিচার বহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে চায়।’
ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থী আন্দোলন হামাস বলেছে, এই আইন ‘হত্যা ও সন্ত্রাসভিত্তিক’ ইসরাইলের নীতির প্রতিফলন।
রোববার ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি বিলটি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে।
তারা বলেছে, এটি ‘গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি ইসরাইলের অঙ্গীকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
ইসরাইলে সীমিত কয়েকটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও দেশটি কার্যত এ শাস্তি প্রয়োগ করে না।
সর্বশেষ ১৯৬২ সালে নাৎসি হলোকাস্টের দায়ে, অ্যাডলফ আইখম্যানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইল পশ্চিম তীর দখল করে রেখেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা যুদ্ধ শুরু হলে ওই এলাকায় সহিংসতা বেড়ে যায়।