শিরোনাম

ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : কোভিড মহামারির সময়ে আফ্রিকার প্রথম ঋণ খেলাপি দেশ হওয়ার পাঁচ বছর পর, বিপুল তামা মজুদকে কেন্দ্র করে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় জাম্বিয়ার অর্থনীতি এখন নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ জ্বালানি (পরিবেশবান্ধব জ্বালানি) ও প্রতিরক্ষা খাতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ গ্রিড, ডেটা সেন্টার ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য অপরিহার্য ধাতু তামার চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেপ টাউন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তামাকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতা, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
শিল্পশক্তি হিসেবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, ভারত ও উপসাগরীয় দেশগুলো সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
প্রেসিডেন্ট হাকাইন্দে হিচিলেমা সোমবার আফ্রিকান মাইনিং ইন্দাবা সম্মেলনে প্রতিনিধিদের বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা ফিরে এসেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সাল থেকে এ খাতে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে।
রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এই দেশটি আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম তামা উৎপাদনকারী দেশ।
সংঘাতপূর্ণ কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রথম তামা উৎপাদনকারী দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী জাম্বিয়া তামা উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম স্থান অধিকার করে আছে।
সৌর প্যানেল ও বায়ু টারবাইনের জন্য প্রয়োজনীয় তামা জাম্বিয়ার জিডিপি’র প্রায় ১৫ শতাংশ ও রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়।
গত বছর উৎপাদন আট শতাংশ বেড়ে ৮ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি হয়েছে এবং সরকার এক দশকের মধ্যে উৎপাদন তিনগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, খনি খাতের প্রবৃদ্ধির ফলে ২০২৫ সালে জাম্বিয়ার প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং চলতি বছরে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা দেশটিকে আফ্রিকার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির কাতারে স্থান দিয়েছে।
হিচিলেমা বলেন, ‘বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে ও ফসল আসছে।’
তিনি অপ্রয়োগিত খনিজ সম্পদ চিহ্নিত করতে দেশব্যাপী ভূতাত্ত্বিক জরিপের পরিকল্পনার কথাও জানান।
তবে ব্যাপক দূষণকারী এ শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে এবং ‘পিট-টু-পোর্ট’ রপ্তানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যেখানে অপরিশোধিত তামা সরাসরি বিদেশে পাঠানো হয়।
রিসোর্স রেজল্যুশনস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল লিটভিন বলেন, ‘ইতিহাস যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি উপনিবেশিক আমলে আফ্রিকার সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করেন।
তার মতে, এতে শঙ্কা রয়েছে যে অভিজাতরা লাভবান হতে পারে, অথচ সাধারণ মানুষ বঞ্চিত থাকবে।
বড় শক্তিগুলোর ‘অংশীদারিত্বের’ বক্তব্যের আড়ালে স্বার্থপরতা লুকিয়ে থাকতে পারে।
জাম্বিয়ার খনি খাতে দীর্ঘদিন ধরে চীনা কোম্পানিগুলো প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ খনি ও গলনাগারে তাদের বড় অংশীদারিত্ব রয়েছে।
কানাডার ফার্স্ট কোয়ান্টাম মিনারেলস জাম্বিয়ার সবচেয়ে বড় করদাতা প্রতিষ্ঠান।
ভারত ও উপসাগরীয় দেশের বিনিয়োগকারীরাও উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক পর আবার বাজারে সক্রিয় হচ্ছে।
চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ১২ বিলিয়ন ডলারের ‘প্রজেক্ট ভল্ট’ নামে একটি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ চালু করেছে, যার লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
গত সেপ্টেম্বর মার্কিন বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা মেটালেক্স কমোডিটিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেটালেক্স আফ্রিকাকে জাম্বিয়ায় কার্যক্রম সম্প্রসারণে ১৪ লাখ ডলারের অনুদান দেয়।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রীর উপদেষ্টা মাইক কপ বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ও বাণিজ্যে মুক্ত বিশ্বের জন্য এটি এক নাটকীয় নতুন অধ্যায়ের সূচনা।’
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ব্যাপক শুল্কের ফলে তামার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।
ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম পরিচালক ডিপ্রোসে মুচেনা বলেন, ‘ঝুঁকি হলো, এই প্রতিযোগিতা এমন এক দৌড়ে পরিণত হতে পারে, যেখানে বাজারের স্বার্থ প্রাধান্য পায় এবং যখন তা উৎপাদনকারী দেশের মানুষের নয়।’
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও জাম্বিয়ার ২ কোটি ১০ লাখ মানুষের ৭০ শতাংশের বেশি দারিদ্র্যে বাস করে।
মুচেনা আরও বলেন, ‘বিশ্ব এখন জাম্বিয়ার তামা নিয়ে সচেতন হচ্ছে। কিন্তু জাম্বিয়া এক শতাব্দী ধরে তামা ও এর প্রভাব নিয়ে বসবাস করছে।’
খনিজ কার্যক্রমজনিত পরিবেশ দূষণ দীর্ঘদিন ধরে জাম্বিয়ার কপারবেল্ট অঞ্চলে সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিটওয়ের কাছে একটি চীনা মালিকানাধীন খনিতে বর্জ্যাধার ভেঙে লাখ লাখ লিটার অ্যাসিডযুক্ত বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে।
বিষাক্ত পদাথর্ দেশটির পানীয় জলের একটি প্রধান উৎস জাম্বিয়ার দীর্ঘতম নদী কাফুয়ের উপনদীতে প্রবেশ করছে।
জাম্বিয়ার কৃষকরা ওই খনির বিরুদ্ধে ৮০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করেছেন।
মুচেনা বলেন, ‘এই উত্থান ভিন্ন হবে কি না, তা নির্ভর করছে শাসনব্যবস্থা, অধিকার ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় কি না তার ওপর।’