শিরোনাম

ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ভোরের আলো ফোটার আগেই জাপানের এক পুরোহিত ও তার অনুসারীরা জড়ো হন। তাদের প্রার্থনা জলবায়ু পরিবর্তন যেন তাদের সেই পবিত্র অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত না করে, যা এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।
ষাটোর্ধ্ব কয়েক ডজন পুরুষ নাগানো প্রদেশের সুওয়া হ্রদের দিকে রওনা হন। তারা সুওয়া হ্রদের এক বিশেষ প্রাকৃতিক ঘটনা ‘গডস ক্রসিং’-এর খোঁজে যাত্রা করে। সাম্প্রতিক দশকগুলোয় নিয়মিত ‘গডস ক্রসিং’-এর ঘটনা থেকে দুর্লভ হয়ে পড়েছে। জাপানের সুওয়া থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
‘সুওয়া’ জাপানের নাগানো প্রদেশের একটি শহর বা অঞ্চল। এলাকাটি সুওয়া হ্রদ, নিখুঁত যন্ত্রশিল্প ও প্রাচীন সুওয়া তাইশা মন্দিরের জন্য পরিচিত। এখানে ইপসনের মতো শিল্প প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।
জাপানি ভাষায় ‘গডস ক্রসিংকে’ বলা হয় ‘মিওয়াতারি’। হ্রদের বরফে ফাটল ধরলে পাতলা বরফের টুকরো ওপরে উঠে একটি উঁচু রেখা তৈরি করে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস এ পথ দিয়েই দেবতারা হ্রদ অতিক্রম করেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিকটবর্তী ইয়াতসুরুগি মন্দিরের পুরোহিতরা প্রতি বছর এই ঘটনার জন্য অপেক্ষা করেন। এতে গড়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের এক অনন্য দলিল।
৫ জানুয়ারি চলতি বছরের পর্যবেক্ষণ শুরু হয় । যার নেতৃত্ব দেন জাপানের শিন্তো ধর্মের পুরোহিত কিয়োশি মিয়াসাকা।
তাদের একজনের হাতে ছিল পুরনো পতাকা। আরেকজনের হাতে বিশাল কুঠার। সবার গায়ে ছিল মন্দিরের প্রতীক সংবলিত পোশাক।
টানা সাত বছর ‘গডস ক্রসিং’ না দেখা গেলেও, তারা তা দেখায় আশাবাদী।
মিয়াসাকা তাদের বলেন, তারা নির্ধারিত ৩০ দিনের যাত্রা শুরু করেছে ।
কিন্তু ভোরের অন্ধকারে যখন তারা ঢেউ খেলানো কালো পানির কাছে পৌঁছায়, মিয়াসাকার চেনা হাসি মিলিয়ে যায়।
‘কী দুঃখজনক’ বলে তিনি পানিতে থার্মোমিটার নামান।
তার পূর্বসূরিরা পুরো হ্রদ কবে বরফে ঢেকেছে ও কবে ‘মিওয়াতারি’ দেখা দিয়েছে, তা লিপিবদ্ধ করতেন।
পরবর্তী সময়ে পুরোহিতরা তাপমাত্রা ও বরফের পুরুত্বও নথিভুক্ত করতে শুরু করেন।
টানা রেকর্ড ১৪৪৩ সাল পর্যন্ত এই প্রাকৃতিক ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায়। যদিও ১৬৮৩ সালে মন্দিরের পুরোহিতরা আনুষ্ঠানিকভাবে এটি খোঁজ করার দায়িত্ব নেন।
টোকিওর ওচানোমিজু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদ নাওকো হাসেগাওয়া বলেন, ‘এর মাধ্যমে শতাব্দী আগে জলবায়ু কেমন ছিল, তা জানা যায়। একই স্থানে শত শত বছর ধরে নেওয়া তথ্যের এমন দলিল বিরল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর তুলনীয় আর কোনো আবহাওয়া গত সংরক্ষণাগার আমরা পাইনি। জলবায়ুর ইতিহাস নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক গবেষকদের কাছে এটি অত্যন্ত মূল্যবান।’
-‘প্রকৃতির সতর্কবার্তা’-
২০১৮ সালের পর থেকে ‘গডস ক্রসিং’ আর দেখা যায়নি। বিজ্ঞানী ও বিশ্বাসী— উভয়েই এর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন।
মিয়াসাকা বলেন, ‘বিশ্বের বহু জায়গায় আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের চিহ্ন দেখছি। সুয়া হ্রদও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রকৃতি মিথ্যা বলে না।’
প্রচলিত বিশ্বাসে বরফের উঁচু রেখাকে ধরা হয় দেবতার পথ হিসেবে। তিনি হ্রদ পেরিয়ে তার দেবী স্ত্রীর কাছে যান।
বিজ্ঞানীরা এর ব্যাখ্যা দেন ভিন্নভাবে।
হ্রদের পুরো পৃষ্ঠ জমাট বাঁধতে হলে, টানা কয়েক দিন তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকতে হয়।
দিন-রাতের তাপমাত্রার ওঠা-নামায় বরফ সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এতে ফাটল সৃষ্টি হয়। নতুন জমাট পানি সেই ফাটলে ঢুকে বরফের খণ্ড তৈরি করে।
খণ্ডগুলো পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গর্জনের মতো শব্দ তোলে। কখনও কখনও সেগুলো চোখের সমান উচ্চতায় উঠে যায়।
টোকিও মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমেরিটাস তাকেহিকো মিকামি ১৯৯৮ সালে এ দৃশ্য দেখেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘তখন বরফের পুরুত্ব ছিল প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার। আমরা হেঁটে হ্রদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়েছিলাম।’
তার গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত প্রায় প্রতি শীতেই এ ঘটনা ঘটত। এরপর সকাল বেলার তাপমাত্রা অনেক সময়ই এত নিচে নামেনি যে পুরো হ্রদ জমে যাবে।
মিকামি বলেন, ‘এটি প্রকৃতির এক সতর্কবার্তা।’
-‘উন্মুক্ত সাগর’-
চলতি মৌসুমে কিছু সময়ের জন্য আশার সঞ্চার হয়েছিল।
২৬ জানুয়ারি, টানা শীতল ভোরের পর মিয়াসাকা ও তার সঙ্গীরা পুরো হ্রদ জমে যাওয়ার রেকর্ড করেন। পুরোহিতের মাপার জন্য বরফের একটি খণ্ড কেটে নেওয়া হয়। এতে তারা আনন্দে হেসে ওঠেন।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বরফ গলে যায়। ‘গডস ক্রসিং’ আর দেখা দেয়নি।
৪ ফেব্রুয়ারি মিয়াসাকা আবার ঘোষণা করেন ‘ওপেন সি’ বা ‘আকে নো উমি।’ অর্থাৎ বসন্তের আগে এ ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।
এর ফলে টানা আট বছর এ দৃশ্য দেখা যায়নি। যা ১৬শ শতকের শুরুর দীর্ঘতম ‘দেবতাহীন’ সময়ের সমান।
তবে মিকামি সেই সময়কার নথি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার ধারণা, হয়তো এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ অনুপস্থিতি।
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী নিয়মিত ঘটলেও এখন পুরো হ্রদ জমে যাওয়া ব্যতিক্রমে পরিণত হয়েছে।
যখন ‘গডস ক্রসিং’ দেখা দেয়, তখন ইয়ৎসুরুগির পুরোহিত বরফের ওপর শিন্তো ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করেন। চার দশকেরও বেশি সময়ে মিয়াসাকা মাত্র ১১ বার তা করতে পেরেছেন।
তবু তিনি এ ঐতিহ্য ও রেখে যাওয়া দলিলকে গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা লিখে রাখব, এটি ছিল ‘ওপেন সি’-এর মৌসুম। ১০০ বছর পরের মানুষের কাছে আমরা এ বার্তা পৌঁছে দেব।’
মিকামির মতে, দেবতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিশ্ব উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রবণতা চলতে থাকলে হয়তো আমরা আর কখনো ‘মিওয়াতারি’ দেখব না।