বাসস
  ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৩৬

মিথ্যা, আতঙ্ক আর ট্রমা, জোরপূর্বক রুশ সেনায় নিয়োগের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বললেন কেনিয়রা

ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ভিক্টরের হাতের আগায় থাকা ক্ষতচিহ্ন তাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় সেই দিনের কথা, যেই দিন ইউক্রেনের একটি ড্রোন হামলায় তিনি আহত হন। 

রুশ সেনাবাহিনীতে জোরপূর্বক নিয়োগ পাওয়ার পর, শত শত তরুণ কেনিয়ানের মতো তিনিও এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই ছিল না। 

ভয়াবহ ওই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা ছিল তার জন্য এক এক ব্যতিক্রমী সৌভাগ্য। 

কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

ভিক্টর, মার্ক, এরিক ও মোজেস— এই চার কেনিয় এএফপিকে জানিয়েছেন, কীভাবে প্রতারণার জাল তাদেরকে ইউক্রেনের সেই ভয়াবহ রণক্ষেত্রে নিয়ে যায়। 

প্রতিশোধের আশঙ্কায় এখন তাদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

নাইরোবি ভিত্তিক একটি নিয়োগকারী সংস্থা রাশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে দেশটির নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের এই প্রক্রিয়া শুরু করে।

২৮ বছর বয়সী ভিক্টরকে বলা হয়েছিল যে তিনি হবেন বিক্রয় কর্মী।

৩২ বছরের মার্ক ও ২৭ বছরের মোজেস ভেবেছিলেন যে তারা নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ করবেন।

৩৭ বছর বয়সী এরিকের ধারণা ছিল যে তিনি উচ্চমানের ক্রীড়া জগতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রতিশ্রুতি ছিল, তাকে মাসে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার ডলার বেতন দেওয়া হবে, আর কেনিয়ার বাস্তবতায় এটা বড় ধরনের একটি অঙ্ক। 

কেনিয়ায় কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট এবং সরকার রেমিট্যান্স বাড়াতে দেশটির নাগরিকদের বিদেশে কাজ করতে উৎসাহ দেয়।

ভুক্তভোগীদের সবাইকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করা হয়, যেখানে অন্যান্য কেনিয়রা সোয়াহিলি ভাষায় আশ্বাস দিচ্ছিলেন যে তাদের সামনে ভালো বেতন আর রোমাঞ্চকর নতুন জীবন অপেক্ষা করছে।
কিন্তু, বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ভিক্টরের প্রথম দিন কাটে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে তিন ঘণ্টা দূরের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে। পরদিন তাকে একটি রুশ সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়, আর সেখানে রুশ ভাষায় লেখা একটি চুক্তিপত্র তার সামনে দেওয়া হয়। তিনি রুশ ভাষার লেখা পড়তেই পারতেন না।

ভিক্টর এএফপিকে তার রুশ সামরিক নথি ও যুদ্ধ পদক দেখিয়ে বলেন, ওরা বলেছিল যে স্বাক্ষর না করলে তোমাকে মেরে ফেলব।

পরে সামরিক হাসপাতালে ভিক্টর তার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কিছু কেনিয়কে দেখতে পান।

ভিক্তর বলেন, হাসপাতালে ভর্তি ওই সব কেনিয়দের কারও পা নেই, কারও হাত নেই। তারা আমাকে জানিয়েছে, গ্রুপে নেতিবাচক কিছু লিখলে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হতো।

মার্ক বলেন, প্রায় চার হাজার ডলার দিলে নতুন নিয়োগ প্রাপ্তদের দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যোগার করা তখন, তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘তাই, চুক্তিতে সই করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।’

এরিকের প্রথম দিন কেটেছিল একটি বাস্কেটবল দলের সঙ্গে অনুশীলনে। 

তখন এরিক ভেবেছিলেন যে তিনি পেশাদার ক্লাবে খেলবেন। 

কিন্তু তিনি জানতেন না, তিনি যে চুক্তিতে সই করেছেন, সেটি আসলে একটি সামরিক চুক্তি ছিল। 

এর পরদিনই তাকে একটি সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়।

মার্ক ও মোজেস জানান, সেখানে এক বছরের সেবার বিনিময়ে তারা খুব সামান্যই অর্থ পেয়েছেন। 

আর ভিক্টর ও এরিকের দাবি, তারা কোনো অর্থই পাননি।

চার জনই রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ‘গ্লোবাল ফেস হিউম্যান রিসোর্সেস’ নামের একটি কেনিয়ান নিয়োগ সংস্থার মাধ্যমে। 
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে: ‘আমাদের এইচআর জাদুকরদের আপনার জন্য রোমাঞ্চকর সুযোগ খুঁজে দিতে দিন।’

এএফপি সংস্থাটির সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা নাইরোবিতে একাধিকবার অবস্থান পরিবর্তন করেছে।

সংস্থাটির এক কর্মী এডওয়ার্ড গিতুকুর বিরুদ্ধে ‘মানব পাচার’-এর অভিযোগে মামলা চলছে। 

গত সেপ্টেম্বরে নাইরোবির উপকণ্ঠে তার ভাড়া নেওয়া একটি ফ্ল্যাটে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২১ তরুণকে উদ্ধার করে।

এই তরুণরা রাশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। 

জামিনে মুক্ত গিতুকু অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে তার আইনজীবী জানান।

চার জনই বলেছেন, তারা গিতুকুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং তিনি এই প্রতারণার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। 

এরিক ও মোজেসের দাবি, গিতুকুরই তাদের নাইরোবি বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন।

গিতুকুর সাবেক আইনজীবী গত সেপ্টেম্বরে এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেন, সংস্থাটি ‘১ হাজারের বেশি মানুষকে’ রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। তবে তারা সবাই নাকি সাবেক কেনিয়ান সৈনিক, যারা স্বেচ্ছায় রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন।

এ সময়েই রুশ নাগরিক মিখাইল লিয়াপিনকে রাশিয়ার অনুরোধে কেনিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়। 
রুশ দূতাবাস দাবি করেছে, মিখাইল লিয়াপিন স্বেচ্ছায় কেনিয়া ছেড়েছেন এবং তিনি কখনোই রুশ সরকারি সংস্থার কর্মী ছিলেন না।

ডিসেম্বরে কেনিয় কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় ২০০ কেনিয়ান ইউক্রেনে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে এবং ২৩ জনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। 

রাশিয়া যাওয়ার আগে সম্ভাব্য অভিবাসীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। 

নাইরোবির একটি ক্লিনিক জানিয়েছে, মাত্র এক মাসের একটু বেশি সময়ে তারা ১৫৭ জনকে পরীক্ষা করেছে। 

ক্লিনিকটির এক কর্মীর দাবি, এদের অধিকাংশই সাবেক কেনিয়ান সৈনিক ছিলেন।

ভিক্টর ও মোজেস অন্য একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা দেন, যেটি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়। 

এএফপি আরও দুটি নিয়োগ সংস্থার সন্ধান পেয়েছে, যারা কেনিয়দের রাশিয়ায় পাঠাচ্ছিল।

গ্লোবাল ফেস হিউম্যান রিসোর্সেসের প্রতিষ্ঠাতা ফেস্টাস ওমওয়াম্বা গত বছর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় রুশ দূতাবাসে 
একাধিকবার যান বলে একটি সূত্র জানায়। 

তিনি এএফপির ফোন ধরেননি।

ইউক্রেনে আগ্রাসনের শুরুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা নিজেদের জাতিগত সংখ্যালঘুদের ‘ব্যয়যোগ্য বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার করছে 

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার মতে, রাশিয়ার বাহিনীতে হতাহতের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে, যা ইউক্রেনের দ্বিগুণ।
এই বিপুল সংখ্যক সেনা হতাহতের কারণে মস্কো আরও দূরে গিয়ে সেনা সংগ্রহ করছে। 

কেনিয়ায় ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ইউরি টোকার বলেন, প্রথমে মধ্য এশিয়া, পরে ভারত ও নেপাল, এখন আফ্রিকা তাদের লক্ষ্য ছিল।

চার কেনিয় জানান, প্রশিক্ষণ শিবির ও যুদ্ধক্ষেত্রে তারা নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, মিসর ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের দেখেছেন।

টোকার বলেন, তারা যেখানে সম্ভব, সেখানেই ‘কামানের খাদ্য’ হয়েছে।

ডনবাসের ভোভচানস্কের কাছে ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা দেন ভিক্টর।

তিনি বলেন, ‘আমাকে দুটি নদী পার হতে হয়েছিল। নদী দুটি ভাসমান লাশে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর একটি বিশাল মাঠ ছিল। মাঠটি শত শত লাশে ঢাকা। ড্রোনের মাঝখানে জীবন হাতে নিতে দৌড়ে পার হতে হতো।’

তার ইউনিটের ২৭ জনের মধ্যে মাত্র দুই জন বেঁচে ছিলেন। 

ভিক্টর একটি লাশের নিচে লুকিয়ে প্রাণে বাঁচেন, তবে ড্রোন হামলায় তার ডান হাত আহত হয়।

এরিককেও একই স্থানে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ২৪ জনের মধ্য থেকে মাত্র তিন জন প্রাণ নিয়ে ফেরেন।

মার্ক ড্রোন থেকে নিক্ষিপ্ত গ্রেনেডে কাঁধে গুরুতর আহত হন। শেষ পর্যন্ত তিন জন মস্কোর একটি হাসপাতালে পৌঁছে কেনিয় দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন। 

মোজেস পালিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও মোজেস মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। উড়ন্ত পাখিকে দেখেও এখন তিনি 
আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যুদ্ধের নির্মম ভয়াবহতায় তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

অনেকে আরও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। 

এদের মধ্যে একজন গ্রেস গাথোনি। 

তিনি জানতে পারেন যে তার স্বামী মার্টিন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তিনি রাশিয়ায় চালক হতে গিয়েছিলেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মস্কো আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।’

৭২ বছর বয়সী চার্লস ওজিয়াম্বো মুটোকা জানুয়ারিতে জানতে পারেন যে তার ছেলে অস্কার গত আগস্টে রাশিয়ায় 

নিহত হয়েছেন। তার লাশটি রাশিয়ার রোস্তভ-অন-ডনে রয়েছে।

তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘রুশ কর্তৃপক্ষের লজ্জা পাওয়া উচিত।’

চার্লস একটি প্রশ্ন রেখে যান, ‘আমরা আমাদের যুদ্ধ নিজেরাই লড়ি। আমরা কখনো রুশদের এনে আমাদের হয়ে 
যুদ্ধ করাই না। তাহলে কেন তারা আমাদের মানুষদের নিয়ে যাচ্ছে?’