বাসস
  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:১৮

কেন চিন পিং একসঙ্গে পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বললেন?

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : চীনের নেতা সি চিনপিং এই সপ্তাহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একের পর এক ফোন ও ভিডিও কল করেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একই দিনে এমন দুইটি আলোচনার আয়োজন বিরল ও গুরুত্ববহ। এ ধরনের পদক্ষেপ চীনের স্থিতিশীল বৈশ্বিক ক্ষমতার অবস্থান শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয়। 

বেইজিং থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

-একই দিনে কেন?-

বুধবার দুপুরে সি ও পুতিনের ভিডিও কলে আলাপের কয়েক ঘণ্টা পর সি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

দ্য এশিয়া গ্রুপের পার্টনার জর্জ চেন এক অনলাইন কমেন্টারিতে লিখেছেন ‘কলটি হওয়ার সময়টা বিরল ও বেশ দৃষ্টি আকর্ষণীয়। সি চিনপিং সাধারণত পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে একের পর এক দুইটি কল করেন না।’

ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সি ও পুতিনের ফোনালাপ চলেছে দেড় ঘণ্টা। 

অন্যদিকে, ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাদের (সি ও ট্রাম্প) মধ্যে ‘দীর্ঘ ও বিস্তারিত’ আলাপ হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের ন্যানইয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লোহ বলেন, ‘এটি দেখায় যে সি চিনপিং নিজের অঙ্গনে দখল রাখতে পারেন এবং সহজেই ফোন তুলে বিশ্বের দুই ‘শক্তিশালী’ নেতার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

লোহ বলেন, চীনের জন্য দুইটি সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কলের সময় ঠিক করা হয়তো শুধু একটি সাধারণ সময়সূচির বিষয়ও হতে পারে।

-কী আলোচনা হলো?—

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ও সি চিনপিং বাণিজ্য, রাশিয়ার ইউক্রেনে যুদ্ধ ও ইরান নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তিনি আরও জানান, চীন এই মরশুমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোয়াবিনের ক্রয় ২০ মিলিয়ন টনে বাড়াতে অঙ্গীকার করেছে।

লোহ বলেন, এই ফোনালাপ নিশ্চিত করেছে যে ‘বিশ্বজুড়ে যা ঘটেছে, তা সত্ত্বেও, মার্কিন-চীনের সম্পর্ক সাময়িকভাবে কৌশলগত স্থিতিশীলতায় থাকবে।

সি ও পুতিন উভয়ই  চীনা-রাশিয়ার সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার প্রশংসা করেছেন। তারা পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে একক সমর্থনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর চেষ্টা করছেন।

রাশিয়ার ২০২২ সালের ইউক্রেন হামলার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ওই হামলার ফলে মস্কো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিকভাবে অনেকটাই একঘরে হয়ে পড়েছে।

এই ফোনালাপের সময়ই আবুধাবিতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রায় চার বছর ধরে চলা সংঘাতের অবসান নিয়ে নতুন দফার আলোচনায় বসেন রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা।

ক্রেমলিন জানায়, ফোনালাপে পুতিন ও সি যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে নিজেদের ‘মতামত’ বিনিময় করেন। একই সঙ্গে ইরানের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

-কথোপকথন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?- এই ফোনালাপগুলো সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী বার্তা দিচ্ছে?-

ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপের সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন আগামী ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চীন সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।

অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আগামী এপ্রিল মাসে বেইজিং সফরের পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আগ্রহী।

এ ছাড়া, পুতিন আগামী নভেম্বর মাসে সি চিনপিংয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠেয় এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) আঞ্চলিক সম্মেলনেও অংশ নেবেন।

এই ফোনালাপগুলো এমন এক সময় করা হলো, যখন সি চিনপিং সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করেছেন। এর উদ্দেশ্য একটাই— ওয়াশিংটনের বিকল্প হিসেবে চীনকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরা।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিজেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প— দু’জনের কাছ থেকেই সম-দূরত্বে রাখার চেষ্টা করছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষক হো।

তিনি এএফপিকে বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি যেভাবেই মোড় নিক না কেন, চীন যেন কোণঠাসা অবস্থায় না পড়ে— সে জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে চাইছে বেইজিং।

এদিকে চীন সাম্প্রতিক এক দুর্নীতি তদন্তে নড়বড়ে অবস্থায় আছে। পিপলস লিবারেশন আর্মির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জাং ইউশিয়াকে ঘিরে তদন্ত শুরু হওয়ায় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফোনালাপগুলোর সময় নির্বাচন সি’র জন্য অভ্যন্তরীণভাবে আত্মবিশ্বাস প্রদর্শনের কৌশল হতে পারে।

সি চিনপিংয়ের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে হো বলেন, দেশের ভেতরে অনিশ্চিত ও নাজুক পরিস্থিতির মুখে ‘দুই দিকেই যোগাযোগ’ বা তথাকথিত ‘টু-টাইমিং’ কলগুলো ছিল মূলত বিশ্বমঞ্চে অভ্যন্তরীণ বার্তা দেওয়ার প্রয়াস।

কয়েকজন বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ককে ‘অটুট’ বলা যাবে না। কারণ বেইজিং ও অনিশ্চিত ট্রাম্প প্রশাসন— উভয় পক্ষই পরস্পরের কাছে এমন কিছু দাবি তুলতে পারে, যা বাস্তবায়নযোগ্য নাও হতে পারে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ইউ সু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীন— কোনো পক্ষই রাশিয়ার প্রতি পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিশীল হবে না। কারণ দু’দেশই মূলত নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় কোনো চুক্তি বিনিময় না করা হলে, চীনের অর্থবহ সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।