বাসস
  ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৯
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:১৯

পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় ৩৩ জনসহ বহু জঙ্গি নিহত

ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে শনিবার বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ‘সমন্বিত’ হামলা চালিয়ে অন্তত ১৫ জন নিরাপত্তা সদস্য ও ১৮ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। সহিংসতায় আক্রান্ত এ অঞ্চলে এটি সাম্প্রতিকতম রক্তক্ষয়ী ঘটনা।

কর্মকর্তারা জানান, এ ঘটনায় ‘তিনজন আত্মঘাতী হামলাকারীসহ’ মোট ৯২ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ মোকাবিলা করে আসছে পাকিস্তান। আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তঘেঁষা খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এ প্রদেশে প্রায়ই নিরাপত্তা বাহিনী, বিদেশি নাগরিক ও বহিরাগতদের ওপর হামলা চালানো হয়।

কোয়েটা থেকে এএফপি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা এক বিবৃতিতে জানায়, প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটা ও বন্দরনগরী গোয়াদারসহ একাধিক স্থানে এসব হামলা সংঘটিত হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘১৮ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক’ এবং ১৫ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। জঙ্গিদের মৃত্যুর সংখ্যা ৯২।

বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।

এর আগে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাষ্ট্রীয় সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।

ইসলামাবাদে অবস্থানরত এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, হামলাগুলো ছিল ‘সমন্বিত, তবে দুর্বলভাবে বাস্তবায়িত’। তিনি বলেন, ‘দুর্বল পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকর প্রতিক্রিয়ার মুখে দ্রুত ভেঙে পড়ায় এসব হামলা ব্যর্থ হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ হামলাগুলো ‘নস্যাৎ’ করায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করেন।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত আমরা এ যুদ্ধ চালিয়ে যাব।’ এ সময় তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পেছনে ভারতের সমর্থনের অভিযোগ তোলেন।

এর আগে চারটি জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা এএফপিকে জানান, হামলাগুলো এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটায় একজন এএফপি সাংবাদিক জানান, শহরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রধান সড়কগুলো ফাঁকা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তিনি একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন।

৩৮ বছর বয়সী আবদুল ওয়ালি বলেন, ‘সকাল থেকেই একের পর এক বিস্ফোরণ হচ্ছে।’ তিনি তার হাসপাতালে ভর্তি মায়ের জন্য রক্তের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘পুলিশ আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে বলে—ফিরে যান, না হলে মারধর করা হবে। আমরা কী করব?’

কোয়েটার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, জঙ্গিরা এক উপ-জেলা প্রশাসককে অপহরণ করেছে।

অন্য একটি জেলার এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানান, জঙ্গিরা ‘একটি জেলা কারাগার থেকে অন্তত ৩০ জন বন্দিকে মুক্ত করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করেছে। তারা একটি পুলিশ স্টেশনেও হামলা চালিয়ে গোলাবারুদ নিয়ে গেছে।’

আক্রান্ত জেলাগুলোতে মোবাইল ফোন সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে এবং যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পুরো প্রদেশজুড়ে ট্রেন চলাচলও স্থগিত করা হয়েছে।

প্রদেশটির সবচেয়ে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে হামলার দায় স্বীকার করেছে।

বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, তারা সামরিক স্থাপনা, পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে।

তারা দাবি করে, সামরিক অভিযান ব্যাহত করতে প্রধান মহাসড়কগুলো অবরোধ করা হয়েছিল।

বিএলএর প্রকাশিত বিবৃতি ও ভিডিওতে হামলাগুলোতে কয়েকজন নারী অংশ নিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

শনিবারের এসব হামলার একদিন আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, প্রদেশটিতে পৃথক দুটি অভিযানে তারা ৪১ জন বিদ্রোহীকে হত্যা করেছে।

বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি বলেন, ‘গত ১২ মাসে নিরাপত্তা বাহিনী বেলুচিস্তানে ৭০০ জনের বেশি সন্ত্রাসীকে নির্মূল করেছে। শুধু গত দুই দিনেই প্রায় ৭০ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব হামলা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের দৃঢ় সংকল্প দুর্বল করতে পারবে না।’

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হলেও বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অন্য প্রদেশ থেকে আসা পাকিস্তানি শ্রমিকদের পাশাপাশি বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপরও হামলা জোরদার করেছে, যাদের তারা প্রদেশটির সম্পদ শোষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

গত বছর বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ৪৫০ যাত্রীবাহী একটি ট্রেনে হামলা চালায়, যার ফলে দুই দিনব্যাপী অবরোধ সৃষ্টি হয় এবং এতে ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে জঙ্গিরা সেতু উড়িয়ে দেয়, হোটেলে হামলা চালায় এবং নিরাপত্তা স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একযোগে হামলা চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে।