শিরোনাম

ঢাকা, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ক্যানিয়ন দিন দিন মোটা হয়ে উঠছে। ইস্তাম্বুলের একটি শপিং সেন্টারে থাকা ধূসর ডোরাকাটা এই সাদা বিড়ালটির ঝুড়ি কেউ চুরি করে নেওয়ার পর থেকেই সে অগাধ খাবার, ভালোবাসা আর আদর পেয়েছে।
ইস্তাম্বুল থেকে এএফপি জানায়, তার দুর্দশার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী এগিয়ে আসেন। কেউ দিয়েছে অফুরন্ত খাবার, কেউ খেলনা, কেউ আরামদায়ক একটি বিড়ালের ঘর, এমনকি এক ভক্ত তার জন্য আলাদা একটি ইনস্টাগ্রাম পেজও খুলে দিয়েছেন।
ক্যানিয়ন একা নয়। সিটি হলের হিসাবে, ইস্তাম্বুলে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি পথবিড়াল রয়েছে, যাদের নিয়মিত খাবার খাওয়ান ও আদর-যত্ন করেন শহরের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বাসিন্দা।
এই পথবিড়ালগুলোর দেখভাল করা হয় প্রায় ধর্মীয় ভক্তির মতো আবেগ নিয়ে।

ইস্তাম্বুলের এশীয় কিংবা ইউরোপীয় অংশ—বা দু’পাশকে যুক্ত করা ফেরিগুলোতেও সবখানেই বিড়াল চোখে পড়ে। কখনো তারা রেস্তোরাঁর চেয়ারে ঘুমাচ্ছে, কখনো সুপারশপে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আবার কখনো দোকানের শো-উইন্ডোতে গোল হয়ে শুয়ে আছে।
এবং খুব কম ক্ষেত্রেই, বলা যায় কখনোই, তাদের বিরক্ত করা হয় না।
৫৭ বছর বয়সী গায়ে কোসেলারদেন ক্যানিয়নের খেলনায় ভরা কোণাটির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ইস্তাম্বুলবাসী প্রাণী ভালোবাসে। এখানে বিড়াল দোকানে ঢুকে সবচেয়ে দামী কাপড়ের ওপরও গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই একে ‘বিড়ালের শহর’ বলা হয়।’
ক্যানিয়নের মতো অনেক পথবিড়ালই এখন পাড়ার আদরের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
কাদিকয় এলাকায় ২০১৬ সালে স্থানীয়রা একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করেন ‘তোমবিলি’র স্মরণে, তুর্কি ভাষায় যার অর্থ ‘মোটা’। বেঞ্চে হেলান দিয়ে এক পা ঝুলিয়ে বসার তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গি ইন্টারনেটে অসংখ্য মিমের জন্ম দিয়েছিল।
ইস্তাম্বুলের ষষ্ঠ শতকের হাগিয়া সোফিয়া গির্জাুথেকেুমসজিদের ট্যাবি বিড়াল গ্লি মারা গেলে, তুর্কি পত্রিকায় প্রকাশিত শোকবার্তায় স্মরণ করা হয় ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সফরের সময় তিনি তাকে আদর করেছিলেন।
পাশের তোপকাপি প্রাসাদে—যা একসময় উসমানি সুলতানদের জাঁকজমকপূর্ণ বাসভবন ছিল—সম্প্রতি শতাব্দীপ্রাচীন একটি ‘ক্যাট ফ্ল্যাপ’ বা বিড়ালের দরজা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানটির পরিচালক ইলহান কোচামান এএফপিকে বলেন, ‘বিড়াল সব সময়ই এখানে ছিল। নিঃসন্দেহে কারণ তারা পরিচ্ছন্ন এবং মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে।’
ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসা ইতিহাস বিভাগের বিশেষজ্ঞ আলতান আরমুতাক জানান, শহরে এত বিড়ালের উপস্থিতির ব্যাখ্যায় প্রায়ই ‘নবী মুহাম্মদের (সা.) প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা’র কথা উল্লেখ করা হয়।
তিনি বলেন, ১৪৫৩ সালে উসমানিরা কনস্টান্টিনোপল দখল করার সময় ‘মাছ ও কসাইয়ের দোকানের বাইরে খাবারের অপেক্ষায় থাকা বিড়ালদের তারা দেখতে পেয়েছিল’।
‘বিড়ালকে খাবার দেওয়া হতো আল্লাহর নামে সদকা হিসেবে।’

ছয় শতক পরও ইস্তাম্বুলে বিড়াল তাদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি ধরে রেখেছে। তবে বর্তমানে সিটি হল তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েছে। গত বছর শহরে ৪৩ হাজারের বেশি বিড়াল নির্বীজ করা হয়েছে, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ১২ গুণ বেশি।
তবে কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন বাসিন্দাদের অতিরিক্ত খাবার দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে, কারণ এতে ইঁদুরের বিস্তার বাড়ছে বলে তারা আশঙ্কা করছে।
সম্প্রতি অঞ্চলটির গভর্নর দাভুত গুল সতর্ক করে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে বিড়াল ইঁদুর তাড়া করে। কিন্তু ইস্তাম্বুলে দেখা যায়, বিড়ালের পাশেই ইঁদুর বসে খাবার খাচ্ছে। এটা আমাদের মোকাবিলা করতে হবে।’
এ ধরনের বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও, তার প্রভাব খুব একটা পড়েনি।
মাচকা পার্কে—যেখানে অন্তত ১০০টি বিড়াল থাকে—ভেজা খাবারের প্যাকেট রেখে দিতে দিতে জার্মানি থেকে আসা ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ফাতিমে ওজারসলান বলেন, ‘আমি এখানে চার মাস ধরে আছি, কিন্তু একটা ইঁদুরও দেখিনি।’
হেসে তিনি যোগ করেন, ‘জার্মানিতে আমাদের অনেক ইঁদুর আছে। কিন্তু এখানে এত বিড়াল থাকায় তারা নিশ্চয়ই ভয় পায়।’
তার মতে, বিড়াল ছাড়া ইস্তাম্বুল কল্পনাই করা যায় না।
তিনি বলেন, ‘এখানে মানুষ আর বিড়াল পাশাপাশি থাকে, সমান মর্যাদায়।’