শিরোনাম

ঢাকা, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : আফগানিস্তানে ন্যাটোভুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্যান্য দেশের সেনাদের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্যের জেরে ইউরোপীয় মিত্রদের ক্ষোভ বাড়তে থাকায় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আংশিকভাবে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসছেন বলে মনে হয়েছে।
তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের এই দাবি—ন্যাটো ‘কিছু সেনা পাঠিয়েছিল’, কিন্তু তারা ‘সামনের সারি থেকে একটু পেছনে, কিছুটা দূরে ছিল’—শনিবার নতুন করে সমালোচনার জন্ম দেয়।
কোপেনহেগেন থেকে এএফপি জানায়, সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর তিনি যুক্তরাজ্যের প্রতি সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়ে ব্রিটিশ সেনাদের প্রশংসা করেন।
শনিবার, এক দিন আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার মন্তব্যকে ‘অপমানজনক’ আখ্যা দেওয়ার পর, ট্রাম্প অন্তত ব্রিটিশ সেনাদের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বলে মনে হয়।
নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের মহান ও অত্যন্ত সাহসী সৈন্যরা সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকবে!’
তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তানে ৪৫৭ জন নিহত হয়েছেন, অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছেন, আর তারা ছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের মধ্যে। এটি এমন এক বন্ধন, যা কখনো ভাঙবে না।’
ট্রাম্প যখন এই বক্তব্য দেন, তখন লন্ডনে ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানান, শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন স্টারমার।
ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আফগানিস্তানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা সাহসী ব্রিটিশ ও মার্কিন সৈন্যদের কথা তুলেছেন—যাদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেননি। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়।’
ট্রাম্পের আগের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কেবল যুক্তরাজ্যই নয়; শনিবার আরও কয়েকজন ইউরোপীয় নেতা তাদের সেনাদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ট্রাম্পের মন্তব্যে তার সরকারের বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে ন্যাটো অভিযানে ‘আমাদের দেশ যে মূল্য দিয়েছে, তা প্রশ্নাতীত—৫৩ জন ইতালীয় সেনা নিহত হয়েছেন এবং ৭০০’র বেশি আহত হয়েছেন।’
তিনি যোগ করেন, ‘এই কারণে আফগানিস্তানে ন্যাটো দেশগুলোর অবদানকে খাটো করে দেখানো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে যখন তা আসে একটি মিত্র রাষ্ট্রের কাছ থেকে।’
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক স্মরণ করেন, ২০১১ সালে আফগানিস্তানে নিহত পাঁচ পোলিশ সেনার বিদায়ী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা।
তিনি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘তখন আমার সঙ্গে থাকা মার্কিন কর্মকর্তারা আমাকে বলেছিলেন, আমেরিকা কখনোই পোলিশ বীরদের ভুলবে না।’
তিনি যোগ করেন, ‘হয়তো তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সেই কথাটি মনে করিয়ে দেবেন।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর দপ্তর শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই অগ্রহণযোগ্য মন্তব্যগুলো জবাব দেওয়ার যোগ্য নয়।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপ্রধান নিহত সেনাদের পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানাতে এবং জাতির কৃতজ্ঞতা পুনর্ব্যক্ত করতে চান।’
ফরাসি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রায় ৯০ জন ফরাসি সেনা নিহত হয়েছেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন শনিবার ফেসবুকে লেখেন, ‘ডেনিশ ভেটেরানরা যে বলেছেন- এই কষ্ট কতটা গভীর, তা কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না- আমি তা পুরোপুরি বুঝি।’
তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তানে মিত্র বাহিনীর সেনাদের অঙ্গীকার নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশ্ন তোলা অগ্রহণযোগ্য।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘জনসংখ্যার তুলনায় ডেনমার্ক ন্যাটোর সেই দেশগুলোর একটি, যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সহ্য করেছে।’
২০০৩ সালে দেশটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৪ লাখ। ডেনিশ বার্তা সংস্থা রিৎসাউয়ের তথ্যমতে, বছরের পর বছর ধরে প্রায় ১২ হাজার ডেনিশ সেনা ও বেসামরিক নাগরিক আফগানিস্তানে পাঠানো হয়েছিল।
ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিবাদে ডেনিশ ভেটেরানরা আগামী ৩১ জানুয়ারি কোপেনহেগেনে নীরব পদযাত্রার ডাক দিয়েছেন।
শুক্রবার স্টারমার বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য আমি অপমানজনক এবং সত্যিই ভয়াবহ বলে মনে করি। যারা নিহত বা আহত হয়েছেন, তাদের স্বজনদের মধ্যে এসব মন্তব্য যে গভীর কষ্ট সৃষ্টি করেছে, তাতে আমি বিস্মিত নই।’
প্রথমে হোয়াইট হাউস স্টারমারের মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একেবারেই সঠিক, ন্যাটোর অন্য যেকোনো দেশের সম্মিলিত অবদানের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্র বেশি করেছে।’
৯/১১ হামলার পর ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে এই প্রথমবার ন্যাটোর যৌথ নিরাপত্তা ধারা কার্যকর করা হয় এবং ব্রিটেনসহ একাধিক মিত্র দেশ আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেয়।
ব্রিটেন ছাড়াও ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইতালি ও পোল্যান্ডের পাশাপাশি কানাডা, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির মতো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সেনারাও সেখানে নিহত হন।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বোরিস পিস্টোরিয়াস তার দেশের দেওয়া ‘ভারী মূল্য’-এর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘২০০১ সালে আমাদের মার্কিন মিত্ররা যখন সহায়তা চেয়েছিল, তখন আমাদের সেনাবাহিনী প্রস্তুত ছিল।’
তিনি যোগ করেন, ‘অনেক আহত ব্যক্তি আজও সেই সময়ের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো এমন এক সময়ে এলো, যখন স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি ঘিরে সৃষ্ট ট্রান্সআটলান্টিক সংকট এখন আপাতত প্রশমিত হয়েছে।
বুধবার ইউরোপ তার দাবির বিরোধিতা করায় ট্রাম্প ইউরোপের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি থেকেও সরে আসেন।