বাসস
  ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:১৭

প্রার্থনা আর চিকিৎসার মাঝখানে আটকে ঘানার মানসিক রোগীরা

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : আক্রা শহরের আচিমোটা অরণ্যে সাম্প্রতিক এক শুক্রবার সকালে দলে দলে উপাসক জড়ো হন। ঘানার রাজধানীর এই সবুজ এলাকা হতাশ ও অসহায় মানুষের জন্য এক আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

আক্রা থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

বাইরে থেকে পার্ক ও পাশের আক্রা চিড়িয়াখানা শান্তই মনে হয়। শুষ্ক হাওয়ায় গাছের ডাল ধীরে দুলছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই ভিন্ন চিত্র। প্রার্থনায় কণ্ঠ উঁচু হচ্ছিল। কেউ কেউ অদৃশ্য শক্তির টানে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন।
একটি ফাঁকা জায়গায় বসে ছিলেন তিরিশের কোঠায় এক নারী। চুল এলোমেলো। দৃষ্টি স্থির, যেন শূন্যের দিকে তাকিয়ে।

তার পরিবার জানায়, এক মাস আগে তিনি ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ হয়ে পড়েন। তারা তাকে এনেছেন দ্য ওয়ার্ল্ড ফর ক্রাইস্ট চার্চের নবী এলিশা আনক্রাহর কাছে। তাদের বিশ্বাস, এই যন্ত্রণা আধ্যাত্মিক।

সাদা পোশাকে মোড়া আনক্রাহ এএফপিকে বলেন, ‘যা ডাক্তাররা সারাতে পারেন না, ঈশ্বর তা পারেন। অনেকেই হাসপাতালে ব্যর্থ হয়ে এখানে আসেন। প্রার্থনা ও উপবাসের মাধ্যমে তারা সুস্থ হন।’

ঘানাজুড়ে এমন দৃশ্য এখন আরও বেশি দেখা যাচ্ছে—কখনও কখনও যার পরিণতি হয় ভয়াবহ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯-এর পর ঘানা ও পুরো আফ্রিকায় বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যা বেড়েছে।

ঘানার মেন্টাল হেলথ অথরিটির তথ্য বলছে, ৩ কোটি ৫০ লক্ষাধিক মানুষের দেশে মাত্র ৮০ জনের একটু বেশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সেবা দিচ্ছেন। সংস্থাটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে।

বড় শহরের বাইরে চিকিৎসা সুবিধা প্রাপ্তি খুবই সীমিত। অথচ কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ঘানার ২১ শতাংশের বেশি মানুষ হালকা থেকে গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবু জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র দুই শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায়।

ফলে অনেক পরিবার আশ্রয় নেয় বনঘেরা ‘প্রার্থনা শিবির’ ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসকদের কাছে। তাদের বিশ্বাস, মানসিক অসুস্থতার শিকড় অভিশাপ, জাদুটোনা বা অশুভ শক্তির ভর করার মধ্যে।

ঘানার পূর্বাঞ্চলের মামফেতে মাউন্ট হোরেব প্রেয়ার ক্যাম্প। আক্রা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। সেখানে উপাসক কিংসলি আজেই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘ট্যাবলেট দিয়ে আত্মার চিকিৎসা হয় না। প্রার্থনার মাধ্যমেই সেগুলো ভাঙতে হয়।’

একই সময়ে আদেইসোর পিওর পাওয়ার প্রেয়ার ক্যাম্পের কর্মী অগাস্টিনা টুমাসি বলেন, ধর্মভিত্তিক এসব কেন্দ্র ঘানার দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘প্রার্থনা শিবির না থাকলে রোগীর চাপে হাসপাতালগুলো ভেঙে পড়ত। আমরা রাষ্ট্রকে সহায়তা করছি।’

তবে বহু প্রার্থনা শিবিরই সংকীর্ণ ও অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ভবনে পরিচালিত হয়।

রোগীরা প্রায়ই খোলা কংক্রিটের মেঝেতে কুঁকড়ে বসে থাকেন। সেখানে অপুষ্টিতে ভূগছেন এমন অনেককে খুঁজে পাওয়া যাবে। কারো কারো শরীরে বেঁধে রাখার দাগ রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, ২০১৭ সালে মানসিক ও মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিকল পরানো নিষিদ্ধ করা হলেও এই চর্চা বন্ধ হয়নি। ২০২৩ সালে সংস্থাটি শুধু ঘানার পূর্বাঞ্চল থেকেই শিকলবন্দি ৩০ জনের বেশি রোগীকে মুক্ত করতে সহায়তা করে।

এক প্রার্থনা শিবিরের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘এনজিও বা সাংবাদিক এলে তারা রোগীদের শিকল খুলে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু বাকি সময় শিকল পরানোই থাকে।’

দেশটির প্রধান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান কর্লে বু টিচিং হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যাবিগেইল হার্ডিং বলেন, মানসিক রোগকে ঘানার অনেক মানুষ ধর্মীয় দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেন।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শিকল পরানো, জোরপূর্বক উপবাস ও একঘরে করে রাখা রোগীদের আরও মানসিক আঘাত দেয়, কার্যকর চিকিৎসা বিলম্বিত করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
ঘানা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ইমানুয়েল আসাম্পং বলেন, সমাধান হিসেবে বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসকদের পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়। কারণ, সমাজের বড় অংশের কাছে তারা এখনও নির্ভরযোগ্য।

তিনি বলেন, ‘আমাদের তাদের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যেমনটা আমরা ঐতিহ্যবাহী ধাত্রীদের ক্ষেত্রে করেছি। তারা যদি বিপদের লক্ষণ দেখতে পান, তাহলে রোগীদের হাসপাতালে পাঠাতে পারবেন।’ 

ঘানায় কেউ নিজের বা অন্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠলে পরিবারের সদস্য, পুলিশ বা উদ্বিগ্ন কোনো নাগরিক আদালতে আবেদন করে বাধ্যতামূলক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন।

তবে এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ও মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী লেডি-অ্যান এসুমান বলেন, ‘মানুষ আইনটি জানে না। তাই সেটি ব্যবহারও করে না।’

এদিকে মেন্টাল হেলথ অথরিটি জানিয়েছে, তারা প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করতে শুরু করেছে।

সংস্থাটির উপপ্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জোসেফিন স্টাইলস ডার্কো বলেন, ‘ধর্ম আমাদের পরিচয়ের গভীরে প্রোথিত। আমরা আধ্যাত্মিকতাকে বাদ দিতে পারি না। তবে যে কোনো সহায়তা যেন মানবিক হয় এবং আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

কিন্তু হাসপাতালের প্রতি গভীর অনাস্থা আর তাৎক্ষণিক অলৌকিক আরোগ্যের আশা এখনও হাজারো মানুষকে দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল ও প্রার্থনাকেন্দ্রে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসার পথে বড় বাধা হয়ে আছে সামাজিক কুসংস্কার। ২০২২ সালের আফ্রোবারোমিটার জরিপে দেখা যায়, ঘানার ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করেন মানসিক রোগ জাদুটোনা বা অভিশাপের ফল।

আচিমোটা অরণ্যের ওপর সূর্য যত ওপরে উঠছিল, প্রার্থনার শব্দ তত জোরালো হচ্ছিল। নবী আনক্রাহর কাছে আনা নারীটি নড়েননি। পাশে দাঁড়িয়ে তার বোন হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলছিলেন—আরোগ্য আসবেই, আজ না হোক, আরও কিছু উপবাসের পর।