বাসস
  ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২৩

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যা: বন্দুকধারীর যাবজ্জীবন

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ (এএফপি) : তিন বছরেরও বেশি সময় পর, জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত বন্দুকধারী টেতসুয়া ইয়ামাগামীকে বুধবার দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই খ ফধুষরমযঃ হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল।

ঘটনাটি এমন একটি দেশে বড় ধরনের বন্দুক-সহিংসতার অভিজ্ঞতা কম থাকার কারণে তা গভীর প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছিল এবং প্রখ্যাত সংরক্ষণশীল আইন-প্রণেতাদের সঙ্গে এক রহস্যময় সেক্ট, ইউনিফিকেশন চার্চের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল।

নারা থেকে এএফপি জানায়, নারা শহরের এক আদালতে দণ্ড ঘোষণার সময় বিচারক শিনিচি তানাকা বলেন, ৪৫ বছর বয়সী ইয়ামাগামী আবে শুট করার জন্য ‘প্রস্তুত ও সংকল্পবদ্ধ’ ছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, ‘তিনি আবে’র পেছন থেকে শুট করেছিলেন এবং যখন আবে সবচেয়ে কম প্রত্যাশা করছিলেন তখনই এটি করেছিলেন,’ যা তার কর্মকাণ্ডকে ‘নিন্দনীয় ও অত্যন্ত দুশ্চরিত্রপূর্ণ, হিসেবে নির্দেশ করে।

বুধবার সকালে আদালতের টিকিটের জন্য মানুষ দীর্ঘ লাইন গঠন করেছিল, যা মামলার প্রতি তীব্র জনসাধারণের আগ্রহ প্রদর্শন করে।

ইয়ামাগামিকে হত্যার পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগেও মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নির্বাচনী প্রচারণার ভাষণকালে নিজ হাতে তৈরি করা একটি বন্দুক ব্যবহার করে জাপানের দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার জন্য তিনি অভিযুক্ত হন।

মামলা অক্টোবর মাসে শুরু হলে ইয়ামাগামী হত্যার দায় স্বীকার করেন। তবে অন্যান্য কিছু অভিযোগে তিনি বিতর্ক করেছেন। জাপানের আইনি ব্যবস্থায়, আসামি দোষ স্বীকার করলেও বিচার চলতে থাকে।

বিচারক তানাকা বলেন, আবে’র মৃত্যুর ‘গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি” হয়েছে এবং তার স্ত্রী এখনও ‘মারাত্মক শোকে’ ভুগছেন।

বাইরে অপেক্ষারত ৩১ বছর বয়সী লজিস্টিক কর্মী মানাবু কাওয়াশিমা সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ইয়ামাগামী সম্পর্কে ‘সত্য জানতে চেয়েছেন’।

তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবে’র ঘটনায় শতাব্দীর ঘটনা ঘটেছে। তার মৃত্যু বিস্ময়কর ছিল। আমি এখানে এসেছি কারণ আমি জানতে চেয়েছি যে যিনি আমার যত্ন নেওয়া একজনকে হত্যা করেছেন, তিনি কে।’

আদালতের বাইরে আরেকজন ব্যানার ধরে বলেছিলেন, বিচারক ইয়ামাগামীর কঠিন জীবনপরিস্থিতি ‘পূর্ণমাত্রায় বিবেচনা করুন।’

প্রসিকিউটররা যুক্তি দিয়েছিলেন, ইয়ামাগামীর আবে’কে হত্যা করার প্রেরণা ইউনিফিকেশন চার্চকে কলঙ্কিত করার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

মাসব্যাপী চলা মামলায় প্রকাশ পায়, ইয়ামাগামীর মায়ের অন্ধভাবে চার্চে দান তার পরিবারকে দেউলিয়া করে ফেলেছিল এবং তিনি বিশ্বাস করেছিলেন ‘প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা’ চার্চকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করছেন। আবে চার্চের কিছু গ্রুপের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছিলেন।

প্রসিকিউটররা আদালতে জানায়, ‘ইয়ামাগামী মনে করেছিলেন, যদি তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আবেনার মতো প্রভাবশালী কাউকে হত্যা করেন, তিনি চার্চের প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন এবং সমালোচনা বাড়াতে পারবেন।’

ইউনিফিকেশন চার্চ ১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং এর সদস্যদের ‘মুনিজ’ বলা হয় প্রতিষ্ঠাতা সান মিয়ং মুনের নামে।

বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা উল্লেখ করেছেন, ইয়ামাগামীর শৈশব ছিল ‘ধর্মীয় অত্যাচারে’ বোনা, যা তার মায়ের ইউনিফিকেশন চার্চে অতিরিক্ত বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত।

তার বাবা আত্মহত্যা করার পর এবং অন্য ছেলে গুরুতর অসুস্থ থাকায়, ইয়ামাগামীর মা পরিবারের সমাধানের জন্য চার্চে সমস্ত সম্পদ দান করেন। আইনজীবীরা বলেন, দানের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ইয়েন হয়ে গিয়েছিল।

ইয়ামাগামী উচ্চশিক্ষা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২০০৫ সালে, তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তার ভাইয়ের আত্মহত্যার আগে।

আবের হত্যার পরে অনুসন্ধান প্রকাশ করে, যে চার্চ ও বহু সংরক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, যা চূড়ান্তভাবে চারজন মন্ত্রীর পদত্যাগে প্রভাব ফেলে।

২০২০ সালে ইয়ামাগামী একটি বন্দুক হাতে তৈরি করা শুরু করেন, যা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পরীক্ষা চালানোর জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। প্রসিকিউটররা বলেছিলেন, এটি আবে’র প্রতি হামলার ‘সতর্কভাবে পরিকল্পিত’ প্রকৃতি নির্দেশ করে।

হত্যাকাণ্ড জাপানের জন্যও একটি সতর্কবার্তা ছিল, যেখানে বিশ্বের কিছু সবচেয়ে কঠোর বন্দুক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দুক-সহিংসতা এতই বিরল যে নিরাপত্তা কর্মীরা প্রথম শটের শব্দ চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন এবং আবে’কে রক্ষা করতে দেরি হয়ে যায়।

প্রসিকিউটররা ইয়ামাগামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়ে বলেছিলেন, এ হত্যা ‘আমাদের যুদ্ধোত্তর ইতিহাসে অভূতপূর্ব’ এবং সমাজে এর প্রভাব ‘অত্যন্ত গুরুতর’।

জাপানের জীবনদণ্ডে মোকাবেলার সম্ভাবনা থাকে, তবে বাস্তবে অনেকেই কারাবাসের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।