বাসস
  ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২২

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করছে জাপান

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ২০১১ সালের ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর প্রথমবারের মতো বুধবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে এর জাপানি পরিচালনাকারী সংস্থা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এখনও কাটেনি।

গত মাসে নিগাতা প্রদেশে অবস্থিত কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর অনুমোদন দেন প্রদেশটির গভর্নর। যদিও জনমত এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বিভক্ত।

টোকিও থেকে এএফপি জানায়, চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর বুধবার টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার (টেপকো) বলেছে, তারা ‘প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে’ এবং ‘আজ সন্ধ্যা ৭টার পর নিয়ন্ত্রণ রড সরিয়ে রিঅ্যাক্টর চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে’।

মঙ্গলবার তীব্র শীত উপেক্ষা করে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী বরফের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রবেশপথের কাছে প্রতিবাদ জানান। কেন্দ্রটির ভবনগুলো জাপান সাগরের উপকূলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

৭৩ বছর বয়সী বাসিন্দা ইউমিকো আবে এএফপিকে বলেন, ‘কাশিওয়াজাকিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যায় টোকিওতে। তাহলে এখানকার মানুষ কেন ঝুঁকির মুখে পড়বে? এর কোনো মানে হয় না।’

গত সেপ্টেম্বরে করা এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ বাসিন্দা কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিপক্ষে, আর ৩৭ শতাংশ এর পক্ষে।

সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতার হিসাবে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলেও বুধবার সাতটি রিঅ্যাক্টরের মধ্যে মাত্র একটি চালু হচ্ছে।

২০১১ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ফুকুশিমার পারমাণবিক কেন্দ্রে তিনটি রিঅ্যাক্টর গলে যাওয়ার ঘটনায় জাপান যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে সরে আসে, তখনই এই কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তবে সম্পদস্বল্প জাপান এখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করতে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত বাড়তি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক জ্বালানি পুনরুজ্জীবনের পথে হাঁটছে।

প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ জ্বালানির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।

ফুকুশিমা-পরবর্তী কঠোর নিরাপত্তা বিধির আওতায় পশ্চিম ও দক্ষিণ জাপানে মূলত ১৪টি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু হয়েছে, যার মধ্যে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৩টি সচল ছিল।

কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ার এই ইউনিটটি হবে টেপকোর পরিচালিত প্রথম রিঅ্যাক্টর, যা ২০১১ সালের পর পুনরায় চালু হচ্ছে। টেপকোই ফুকুশিমা দাইইচি কেন্দ্রও পরিচালনা করে, যা বর্তমানে ধাপে ধাপে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

৮১ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী কেইসুকে আবে বলেন, ‘বিপর্যয়ের প্রায় ১৫ বছর পরও ফুকুশিমার পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আর টেপকো আবার একটি কেন্দ্র চালু করতে চায়—আমার কাছে এটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিশাল কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কমপ্লেক্সে ১৫ মিটার (৫০ ফুট) উঁচু সুনামি প্রতিরোধ দেয়াল, উঁচুতে স্থাপিত জরুরি বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা উন্নয়ন যুক্ত করা হয়েছে।

তবে বাসিন্দারা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা ঘনঘন তথ্য গোপনের কেলেঙ্কারি, ছোটখাটো দুর্ঘটনা এবং অপর্যাপ্ত বলে দাবি করা সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন।

কারিওয়ার ৭৯ বছর বয়সী বাসিন্দা চিয়ে তাকাকাওয়া বলেন, ‘জরুরি অবস্থায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব—আমি তা মনে করি না।’

৮ জানুয়ারি কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিরোধিতা করা সাতটি গোষ্ঠী প্রায় ৪০ হাজার মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি পিটিশন টেপকো ও জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়।

পিটিশনে বলা হয়, কেন্দ্রটি একটি সক্রিয় ভূমিকম্প-ফল্ট অঞ্চলে অবস্থিত এবং ২০০৭ সালেও এটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে আক্রান্ত হয়েছিল।

পিটিশনে আরও বলা হয়, ‘আরেকটি অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্পে আক্রান্ত হওয়ার ভয় আমরা দূর করতে পারি না।’

‘টোকিওতে বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য অসংখ্য মানুষকে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত করে তোলা—এটি সহনীয় নয়।’

২০১১ সালের বিপর্যয়ের আগে, যাতে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান, জাপানের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসত পারমাণবিক শক্তি থেকে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জাপানের পারমাণবিক শিল্প খাতে একাধিক কেলেঙ্কারি ও ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিকম্প ঝুঁকি কম দেখাতে চুবু ইলেকট্রিক পাওয়ারের তথ্য জালিয়াতির ঘটনাও রয়েছে।

কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ায় শনিবার টেপকো জানায়, পরীক্ষার সময় একটি অ্যালার্ম ব্যবস্থা কাজ করেনি।

আসাহি দৈনিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টেপকোর প্রেসিডেন্ট তোমোআকি কোবায়াকাওয়া বলেন, ‘নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর অর্থ হলো, পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে জড়িত অপারেটরদের কখনোই উদ্ধত বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া চলবে না।’

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও রাশিয়ার পর জাপান বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম একক দেশভিত্তিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকারী এবং দেশটি আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

২০২৩ সালে জাপানের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ এসেছে কয়লা, গ্যাস ও তেল থেকে। আগামী ১৫ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পারমাণবিক শক্তি বাড়িয়ে এ হার ৩০ু৪০ শতাংশে নামাতে চায় টোকিও।

সরকার ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদিত এক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় একুপঞ্চমাংশ আসবে পারমাণবিক শক্তি থেকে—যা ২০২৩ু২৪ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৮.৫ শতাংশ।

এদিকে, ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার বিশাল কাজ এখনও জাপানের সামনে রয়ে গেছে—যা শেষ হতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে।