শিরোনাম

ঢাকা, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : গিনির ২৩ বছর বয়সী তরুণী মা মারিয়াম সুমাহ প্রায় নয় মাস আগে শেষবারের মতো তার শিশু সন্তান সাবিনাকে দেখেছেন। বর্তমানে এই মা আছেন গিনিতে, আর তার এক বছর বয়সী মেয়ে সাবিনা তার মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেলারুশের একটি এতিমখানায় পালিত হচ্ছে।
সুমাহ এবং তার পক্ষে থাকা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কয়েক মাস আগে বেলারুশ কর্তৃপক্ষ সুমাহকে জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠায়। কিন্তু শিশুকন্যাকে সুমাহর সঙ্গে যেতে দেয়া হয়নি।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন ও গিনির কূটনীতিকরা এই অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
গিনি রাজধানী কোনাক্রির বস্তি এলাকায় এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুমাহ বলেন, ‘আমি তাদেরকে অনেক অনুরোধ করেছি, তাদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি, যেন তারা এটা (শিশুকে তার থেকে আলাদা করা) না করে।’
কথা বলার সময় তিনি তার মোবাইল ফোনে শিশু সাবিনার সাম্প্রতিক ছবি দেখান।
গত নভেম্বরে লাল পোশাক পরা এই ছোট্ট মেয়েটির বয়স এক বছর পূর্ণ হয়েছে।
দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশায় এক বুক রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের উদ্দেশ্যে সুমাহ আফ্রিকা পাড়ি দিয়ে বেলারুশে যান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অভিবাসন রুট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিযোগ করেছে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর সরকার অভিবাসীদের বেলারুশ হয়ে ইইউতে প্রবেশে উৎসাহ দিচ্ছে।
অনলাইনে প্রলোভনের শিকার হয়ে শিক্ষার্থী ভিসায় বেলারুশে যান সুমাহ।
তিনি বলেন, ‘আমি সমুদ্রপথে ইউরোপে যেতে চাইনি। মানচিত্রে দেখলাম, বেলারুশ চারদিকে শেনজেনভুক্ত দেশ দিয়ে ঘেরা।’
বেলারুশে অবস্থানকালে ভিসা নবায়নের চেষ্টা করার সময়ই তার দুর্ভোগ শুরু হয়। সেখানে এক গিনির নাগরিকের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে তিনি গর্ভবতী হন।
ওই ব্যক্তি পরে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় তাকে ছেড়ে চলে যান।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই সুমাহ’র প্রসববেদনা শুরু হন। জন্মের সময় সাবিনার ওজন ছিল মাত্র ৬০০ গ্রাম। তাকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়।
তবে সুমাহর অভিযোগ, এরপর থেকেই তাকে সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয় এবং বিপুল চিকিৎসা বিল পরিশোধের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। পরে অভিবাসন আইন ভঙ্গের অভিযোগে তাকে আটক করা হয় এবং কন্যাসন্তানকে রেখে জোরপূর্বক বিমানে তুলে গিনিতে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি তাদেরকে বারবার বলেছি,আমার বাচ্চাকে ছাড়া আমি যাব না। অনুরোধ করেছি, শুধু তাকে সুস্থ হতে দিন, তারপর আমরা একসঙ্গে দেশে ফিরে যাব।’
তরুণীটি আরও বলেন, তারা আমার সেই অনুরোধে কর্ণপাত করেনি।
গত আগস্টে বহিষ্কারের পর থেকে তিনি মাত্র দু’বার স্বল্প সময়ের ভিডিও কলে সাবিনাকে দেখতে পেরেছেন। শিশুটি বর্তমানে মিনস্কের একটি এতিমখানায় রয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনাকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
মস্কোতে অবস্থিত গিনির দূতাবাস জানিয়েছে, তারা বিষয়টি ‘গভীর মানবিক উদ্বেগের সঙ্গে’ পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর ব্যাখ্যা দাবি করেছে।
এই দূতাবাস বেলারুশেও দায়িত্বে রয়েছে।
দূতাবাস আরও জানায়, ইউনিসেফ বেলারুশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং শিশুটির জন্য মানবিক সহায়তা সংগঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বিষয়ে এএফপি’র অনুরোধে বেলারুশ কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি।
সুমাহ বলেন, জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের পর হাসপাতালে থাকাকালেই তার সন্তানের বিষয়ে তথ্য গোপন করা শুরু হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করতাম, আমার বাচ্চা কেমন আছে? তারা বলত, সে (মেয়েটি) অসুস্থ ও ক্লান্ত।’
দশ দিন পর তিনি মিনস্ক শহরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খুঁজে অবশেষে সেই হাসপাতালটি খুঁজে পান, যেখানে তার মেয়েকে রাখা হয়েছিল এবং প্রতিদিন সেখানে যেতেন।
পরে শিশুটিকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে প্রায় ৩৩ হাজার ডলারের চিকিৎসা বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়।
সুমাহ বলেন, টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাকে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
সুমাহ জানান, গত গ্রীষ্মে হাসপাতালের এক নারী তাকে জানান যে সাবিনাকে এতিমখানায় পাঠানো হচ্ছে।
স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, কি?! কোন এতিমখানা?’
সুমাহ নিজেও একজন এতিম।
এ সময় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের চাপ আরও বাড়ে। নতুন করে পড়াশোনার মাধ্যমে ভিসা নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
জুলাই মাসে তাকে অভিবাসন আইন ভঙ্গের অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়।
বেলারুশে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান কনস্টান্টা এ ঘটনাকে অত্যন্ত কঠোর ও অমানবিক পদক্ষেপ বলে এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।
সংগঠনটির প্রতিনিধি এনিরা ব্রোনিৎসকায়া বলেন, ‘এটি একটি প্রশাসনিক অপরাধ ছিল, কোনোভাবেই ফৌজদারি নয়। কিন্তু তারা এই মা ও তার সন্তানকে আলাদা করতে একটুও দ্বিধা করেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাকে সন্তানের অধিকার না দিয়ে তাকে হুমকি দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, তার মাতৃত্বের অধিকার বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছিল না।’
কারাগারে থাকাকালে অভিবাসন কর্মকর্তারা সামুহকে দেশে ফেরার টিকিটের টাকা জোগাড় করতে আত্মীয় খুঁজতে বলেন। কিন্তু কেউ সাহায্য করতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘আমি আর যাই হোক, সন্তান ছাড়া দেশে ফিরতে রাজি ছিলাম না।’
একদিন হঠাৎ তাকে হাতকড়া পরিয়ে বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। ইস্তাম্বুলগামী ফ্লাইটে তুলে তাকে বলা হয়, আর যেন বেলারুশে ফিরে না আসেন।
তুরস্কে পৌঁছে সুমাহ ফোন করে তাকে লালন-পালন করে বড় করা এক নারীকে জানান, ‘আমি আসছি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমার কিছুই নেই। এমনকি আমার সন্তানটাও না।’