বাসস
  ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩৯

আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চল ছাড়তে কুর্দি বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে সিরীয় সেনাবাহিনী

ঢাকা, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : গত সপ্তাহে আলেপ্পো নগরীতে এক প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর সিরীয় সেনাবাহিনী মঙ্গলবার কুর্দি বাহিনীকে নগরীর পূর্বাঞ্চল থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে উভয় পক্ষ রাতে নতুন সশস্ত্র সংঘর্ষের খবর জানিয়েছে।

সিরিয়ার আলেপ্পো নগরী থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন সিরীয় সরকার সারাদেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। 

তবে মার্চে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, কুর্দিদের কার্যত স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন ও বাহিনীকে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি থমকে আছে।

দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান কুর্দি শহর কামিশলিতে আলেপ্পোর সহিংসতার প্রতিবাদে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। 

এ সময় অনেকে সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার ছবি পুড়িয়ে দেয় বলে এএফপির এক প্রতিবেদক জানান।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সেনাবাহিনীর এক বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে একটি মানচিত্র দেখিয়ে আলেপ্পো নগরীর পূর্বে বিস্তৃত এলাকাকে ‘বন্ধ সামরিক অঞ্চল’ ঘোষণা করা হয়। 

 সেনাবাহিনীর ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই এলাকার সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ইউফ্রেতিস নদীর পূর্বে সরে যেতে হবে।’

কুর্দি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই এলাকা আলেপ্পো থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের দেইর হাফেরের কাছ থেকে শুরু করে আরো প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে ইউফ্রেতিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। এই এলাকা দক্ষিণ দিকেও প্রসারিত।

আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চলে রাতভর নতুন করে সংঘর্ষের কথা জানিয়েছে সিরীয় সেনাবাহিনী ও কুর্দি বাহিনী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সামরিক সূত্র সরকারি সানা সংবাদ সংস্থাকে জানায়, কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) আলেপ্পোর পূর্বে হুমাইমাহ গ্রামের আশপাশে সেনা অবস্থান ও বেসামরিক বাড়িঘর লক্ষ্য করে ভারী মেশিনগান ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালাচ্ছে। 

সেনাবাহিনী এসডিএফকে পাল্টা জবাব দিচ্ছে।

এসডিএফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, তারা দক্ষিণে জুবাইদা গ্রামের 
কাছে একটি ‘অনুপ্রবেশের চেষ্টাও’ প্রতিহত করেছে। 

তারা ড্রোন হামলার কথাও জানায়, যার একটিতে তাদের কয়েকজন যোদ্ধা আহত হয়েছেন।

সোমবার সিরিয়া যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এসডিএফ-এর বিরুদ্ধে দেইর হাফেরে অতিরিক্ত বাহিনী পাঠানোর অভিযোগ তোলে। জবাবে সরকারও সেখানে নিজেদের সদস্য মোতায়েন করার কথা জানায়।

এসডিএফ কুর্দিদের আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনের কার্যত সেনাবাহিনী। 

তারা দেশের তেলসমৃদ্ধ উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। 

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ও ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় এ সব এলাকা তাদের দখলে আসে।

মঙ্গলবার এএফপি’র এক প্রতিবেদক দেখেন, সরকারপন্থী বাহিনী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি ও কামানসহ অতিরিক্ত সেনা সদস্যদের দেইর হাফেরের দিকে পাঠাচ্ছে।

কুর্দি বাহিনী দেইর হাফেরের আশপাশে তাদের সদস্য বাড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা সরকারকে শহরটিতে হামলার জন্য দায়ী করে। 

তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, সেখানে এসডিএফ-এর স্নাইপারের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন।

-‘রক্তপাত’-

কুর্দি প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এলহাম আহমাদ বলেন, সরকারপন্থী বাহিনী ‘আরেকটি হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এই হামলার আসল উদ্দেশ্য হলো কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর পূর্ণমাত্রার হামলা।’ 

তিনি মার্চের চুক্তি ভঙ্গ করে সরকার ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করেছে বলে অভিযোগ করেন।

সপ্তাহের শেষে সিরীয় সরকার আলেপ্পো শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কুর্দি অধ্যুষিত শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়াহ এলাকা দখলের পর সেখানকার যোদ্ধাদের উত্তর-পূর্বের কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়।

গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া সহিংসতা নিয়ে উভয় পক্ষ পরস্পরকে দায়ী করছে। ওই সহিংসতায় শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ নিহত ও কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

কামিশলিতে সাধারণ ধর্মঘটের অংশ হিসেবে দোকানপাট বন্ধ ছিল। হাজারো মানুষ আলেপ্পোর সংঘর্ষের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। অনেকের হাতে ছিল কুর্দি পতাকা এবং এসডিএফ ও তাদের প্রধান মাজলুম আবদির সমর্থনে ব্যানার।

এ সময় বিক্ষোভকারীরা  প্রেসিডেন্ট শারার আগের যুদ্ধনাম আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি নামের প্রতি ইঙ্গিত করে স্লোগান দেয়, ‘চলে যাও জোলানি!’

পিকেকে, তুরস্ক কিছু বিক্ষোভকারী তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ছবি পুড়িয়ে দেয়। 

তার দেশ সিরীয় সরকারের আলেপ্পো অভিযানকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান’ বলে প্রশংসা করেছে।

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফ-এর বিরোধিতা করে আসছে। আঙ্কারা তাদের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)’র শাখা হিসেবে দেখে এবং দক্ষিণ সীমান্তে সংগঠনটিকে বড় হুমকি মনে করে।

গত বছর পিকেকে তুরস্ক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংগ্রামের অবসানের ঘোষণা দেয় ও অস্ত্র ধ্বংস শুরু করে। 

তবে আঙ্কারা জোর দিয়ে বলছে, এই প্রক্রিয়ায় সিরিয়ার সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

মঙ্গলবার পিকেকে আলেপ্পোর কুর্দি মহল্লায় হামলাকে আঙ্কারা ও পিকেকে’র মধ্যে শান্তি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করার চেষ্টা বলে অভিহিত করে।

একদিন আগে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলও কুর্দি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তোলে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, আলেপ্পোর সহিংসতায় ৪৫ জন বেসামরিক নাগরিক এবং উভয় পক্ষের ৬০ জন সেনা ও যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

আলেপ্পোর সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ মঙ্গলবার এএফপিকে জানান, লড়াই শেষ হওয়ার পর কুর্দি অধ্যুষিত দুই এলাকা থেকে উদ্ধারকর্মীরা ৫০টি লাশ উদ্ধার করেছে। 

তবে এই লাশগুলো যোদ্ধাদের, না-কি বেসামরিক মানুষের, সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি।