বাসস
  ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৮

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় পশ্চিম তীরে বাস্তুচ্যুত বেদুইন সম্প্রদায়

ঢাকা, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : মনে কষ্ট নিয়ে পশ্চিম তীরের একটি গ্রামে বসবাসকারী বেদুইনরা তাদের ভেড়ার খোঁয়াড় ভেঙে ফেলছেন এবং মালপত্র ট্রাকে তুলছেন।

ইসরাইলি দখলকৃত এই ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মুখে তারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, আধা-যাযাবর বেদুইনরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ছেন। 

তাদের অভিযোগ, কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা না থাকার ফলে, তারা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শিকার হচ্ছেন।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

রাস আইন আল-আউজা গ্রামের বাসিন্দা বেদুইন ফারহান জাহালিন এএফপিকে বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে দিনরাত বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক ও পুনঃপুন হামলার ফলে আজ আমাদের পুরো সম্প্রদায় ভেঙে পড়েছে।’

১৯৬৭ সালে ইসরাইল পশ্চিম তীর দখল নেওয়ার পর থেকে সেখানে ইসরাইলি বসতি ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে এই ভূখণ্ডে পাঁচ লাখের বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে। 

এখানে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ।

অল্পসংখ্যক বসতি স্থাপনকারী স্থানীয়দের ওপর সহিংসতা চালিয়ে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছে। 

জাতিসংঘের তথ্য মতে, গত বছরের অক্টোবরে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সংখ্যা রেকর্ড ২৬০টিতে পৌঁছায়। 

এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি পরিস্থিতি।

দীর্ঘদিন ধরেই জাহালিনের সম্প্রদায়ের ওপর বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা ঝুলে ছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই চাপ আরও বেড়েছে। গ্রামের ১৩০টি পরিবারের প্রায় অর্ধেক ইতোমধ্যেই এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাহালিন জানান, স্থানীয় কা’বনেহ গোত্রের ২০টি পরিবার গত সপ্তাহে চলে গেছে এবং আরও প্রায় ৫০টি পরিবার ঘরবাড়ি খুলে ফেলছে।

গ্রামের আশপাশে বসতি স্থাপনকারীদের ট্রেলার ছড়িয়ে আছে, যা ধীরে ধীরে স্থায়ী ভিত্তির ঘরে রূপ নিচ্ছে। এর কিছু বেদুইনদের ঘর থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে নির্মাণ করা হয়েছে।

গত বছরের মে মাসে বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ঝর্ণাটি থেকে গ্রামবাসীদের পানি সরবরাহের ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ঝর্ণাটির নামেই এই গ্রামের নাম।  

পশ্চিমে পাথুরে পাহাড় ও পূর্বে জর্ডান উপত্যকার সমতল ভূমির মাঝখানে অবস্থিত এই ঝর্ণাই বেদুইন সম্প্রদায়কে স্বনির্ভরভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

কিন্তু বসতি স্থাপনকারীরা বিদ্যুৎ সংযোগ ও সেচ পাইপ কেটে দেওয়া কিংবা নিজেদের পশু চরাতে এনে বেদুইনদের ঘরের কাছে ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কায় বাসিন্দাদের সারাক্ষণ পাহারা দিতে হচ্ছে। এই চাপেই অনেক পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নাইফ জায়েদ বলেন, ‘আপনি যদি নিজের ঘর রক্ষা করতে যান, তাহলে (ইসরাইলি) পুলিশ বা সেনাবাহিনী এসে আপনাকে গ্রেফতার করবে। আমরা কিছুই করতে পারি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ যাওয়ার মতো নির্দিষ্ট কোনো জায়গা পাচ্ছে না। সবাই নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’

অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বেদুইন পশুপালন করেন। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় যখন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা নিজেদের পশু চরাতে আনে, তখন জমি ও খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং সহিংসতার ঝুঁকি আরও তীব্র হয়।

বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো এই কৌশলকে ‘পাস্টোরাল কলোনিয়ালিজম’ বা পশুপালনভিত্তিক উপনিবেশবাদ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইসরাইলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির গত নভেম্বর মাসে সহিংসতা বন্ধের অঙ্গীকার করেন। চলতি মাসে সেনাবাহিনী ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন নজরদারি প্রযুক্তি চালুর ঘোষণা দেয়। 

ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নিয়ন্ত্রণ করা।

এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, রাস আল-আইন এলাকায় সংঘটিত ঘটনাগুলো আমাদের জানা আছে। জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ রোধ ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী (ইসরাইলি) বাহিনী সেখানে প্রবেশ করছে।

সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার কারণে এলাকায় সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানায় তারা।

রাস আইন আল-আউজার আরেক পশুপালক নাআমান এহরিজাত এএফপিকে জানান, স্থানান্তরের আগে তিনি ইতোমধ্যে তার ভেড়াগুলো দক্ষিণ-পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

তবে জাহালিনের আশঙ্কা, পশ্চিম তীরের অন্য গ্রামীণ এলাকায় গেলেও ভবিষ্যতে আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। 

এক্ষেত্রে তিনি উৎখাত হওয়া কয়েকটি পরিবারের উদাহরণ দেন। 

রাস আইন আল-আউজা গ্রামের এই বেদুইন বাসিন্দা জানান, নিকটবর্তী জিফতলিক গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবার একবার উৎখাত হয়ে জর্ডান উপত্যকার আরেকটি গ্রামে গিয়ে আবারও বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম তীরের প্রধান সড়কগুলোতে আরবিতে লেখা স্লোগান দেখা যাচ্ছে— ‘ফিলিস্তিনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’

১৯৯১ সাল থেকে রাস আইন আল-আউজায় বসবাসকারী জাহালিন বলেন, এই বার্তাই তার অনুভূতির প্রতিফলন।

তিনি আরও বলেন, ‘বসতি স্থাপনকারীরা বেদুইন জীবনধারা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় মুছে ফেলা হয়েছে ও বেদুইনদের জীবনযাত্রা বদলাতে সব ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।’