শিরোনাম

ঢাকা, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : চীনের উত্তরাঞ্চলীয় হেবেই প্রদেশের গ্রামবাসীরা এখন বাসস্থান উষ্ণ রাখার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ, প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর দেওয়া সরকারি ভর্তুকির বেশিরভাগই ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ঘন শীতকালীন ধোঁয়াশা কমাতে কয়লা পোড়ানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রায় এক দশক পর, প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর থেকে এখন ভর্তুকিও প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে প্রচণ্ড ঠান্ডার এই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষেরা কষ্টে দিনাতিপাত করছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
২০১৭ সালে বেইজিং সরকার উত্তর চীনের বহু অঞ্চলে কয়লাচালিত চুলা বন্ধ করে বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রীয় সরকার তখন চুলা পরিবর্তনে আর্থিক সহায়তা দিলেও, তিন বছর পর সেই ভর্তুকিও বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পরবর্তীতে সরকারের অতিরিক্ত সহায়তাও ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
বেইজিং থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে হেবেইয়ের জুসুই জেলায় গ্রামবাসীরা এএফপিকে জানান, আয়ের বড় অংশ চলে যাওয়ায়, অর্থের অভাবে এই প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও এখন তারা হিটার চালু রাখতে পারছেন না।
স্থানীয় এক ষাটোর্ধ্ব কৃষক বলেন, ‘সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। শুধু বাসস্থান উষ্ণ রাখার জন্য মাসে ১ হাজার ইউয়ান (প্রায় ১৪৩ ডলার) খরচ হয়, এই ব্যয় কি কেউ বহন করতে পারে?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘পরিষ্কার বাতাস সবাই পছন্দ করে। কিন্তু পরিষ্কার বাতাসের মূল্যটা খুব বেশি।’
এএফপি সফরের দিন তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ছিল ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে আর সর্বনিম্ন নেমেছিল মাইনাস ৭ ডিগ্রিতে।
একটি রেস্তোরাঁর কর্মী ইয়িন ছুনলান (৪৮) জানান, তার শ্বশুর-শাশুড়ির ছয় কক্ষের গ্রামের বাড়ি উষ্ণ রাখতে বছরে প্রায় ৭ হাজার ইউয়ান খরচ হয়। অথচ শহরের ফ্ল্যাটে তার নিজের বাড়ি উষ্ণ রাখতে খরচ হয় এর এক-তৃতীয়াংশ।
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামে তাপমাত্রা ঠিক রাখতে বেশি গ্যাস লাগে, তবুও তেমন উষ্ণ হয় না। ফলে গ্যাস আর টাকা, দুটোরই অপচয়।’
এই অবস্থায় শীত থেকে বাঁচতে তার শ্বশুর-শাশুড়ি অতিরিক্ত কম্বল ব্যবহার করেন।
ইয়িন চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘দেখলে খুব কষ্ট লাগে। কিন্তু কিছুই করার নেই।’
এক গ্রামে সত্তরোর্ধ্ব এক নারী দিনের বেলা হিটার বন্ধ রেখে সবুজ রঙের মোটা জ্যাকেট পরে উঠান পার হচ্ছিলেন।
রান্নাঘরের ওপর বসানো হিটিং সিস্টেমের সুইচবোর্ডে তখন ‘অফ’ লেখা।
তিনি বলেন, ডায়াল ঘুরিয়ে তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তোলা যায়। প্রশ্ন করা হলে, ঘর সত্যিই এতটা গরম হয় কি-না, তিনি হেসে ওঠেন।
নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে বেইয়ের গ্রামবাসীরা গ্যাসের খরচ বাঁচাতে লেপ-কাঁথা জড়িয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
‘ফার্মার্স ডেইলি’-তে প্রকাশিত ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি’র মতামত বিভাগে পুনঃপ্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হেবেইয়ের গ্রামে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩ দশমিক ৪ ইউয়ান, যেখানে বেইজিংয়ের গ্রামে তা ২ দশমিক ৬ ইউয়ান।
এখানে বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এই মূল্য-বৈষম্য অন্যায়।
তবে প্রতিবেদনটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয় এবং সিসিটিভিসহ সব পুনঃপ্রকাশ কয়েক দিনের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২১ সাল পর্যন্ত হেবেই প্রদেশে পরিষ্কার জ্বালানির জন্য ১৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউয়ান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন হিটিং সিস্টেম স্থাপন ও গ্যাস বিলের জন্য যে তিন বছরের ভর্তুকি ছিল, তা আর নবায়ন করা হবে না।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার সময়েই এই সিদ্ধান্ত আসে।
গত বছর চীনা কর্তৃপক্ষ জানায়, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি কমেছে।
জুসুইয়ের স্থানীয় এক সরকারি প্ল্যাটফর্মে ২০১৭ সালে বলা হয়েছিল, কিছু পরিবার ৩০০ ইউয়ান গ্যাস ভর্তুকি পাবে।
কিন্তু শ্রমিক ঝাং ইয়ানজুন (৫৫) বলেন, ‘মৌসুমে কয়েক হাজার ইউয়ান বিলের পাশে ৩০০ বা ২০০ ইউয়ান ভর্তুকি কিছুই না।’
তিনি আরও জানান, গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত শুধু বাসস্থান উষ্ণ রাখতেই তার খরচ হয়েছে ৫ হাজার ইউয়ানের বেশি।