বাসস
  ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৪৯

আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় গোলাবর্ষণ শুরু সিরীয় সেনাবাহিনীর

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): বেসামরিকদের এলাকা ছাড়ার জন্য দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বুধবার উত্তরাঞ্চলীয় শহর আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে গোলাবর্ষণ শুরু করেছে সিরীয় সেনাবাহিনী। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের দ্বিতীয় দিনে এক এএফপি সংবাদদাতা এ তথ্য জানান।

মঙ্গলবার শুরু হওয়া প্রাণঘাতী সংঘর্ষের জন্য কে দায়ী- এ নিয়ে সিরীয় সরকার ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। এ পর্যন্ত উভয় পক্ষ মার্চে হওয়া সেই চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে, যার আওতায় কুর্দিদের আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন ও সামরিক কাঠামোকে সিরিয়ার নতুন ইসলামপন্থী সরকারের সঙ্গে একীভূত করার কথা ছিল।

আলেপ্পো থেকে এএফপি জানায়, সিরীয় সামরিক বাহিনী ঘোষণা দেয়, বিকেল ৩টা (গ্রিনিচ মান সময় ১২টা) থেকে শহরের শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়েহ এলাকাকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিকদের জন্য ‘দুটি নিরাপদ মানবিক করিডোর’ খোলা হয়।

সময়সীমার আগে আলেপ্পোয় থাকা এএফপি সংবাদদাতারা দেখেন, হাজারো মানুষ এলাকা ছাড়ছেন—অনেক পরিবার শিশুদের নিয়ে, হাতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কেউ কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না।

৩৮ বছর বয়সী আহমদ, যিনি শুধু নিজের প্রথম নামই জানান, পিঠে ছেলেকে বহন করতে করতে এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে এসেছি, কোথায় যাব জানি নাৃ ১৪ বছরের যুদ্ধ, আমার মনে হয় এটুকুই যথেষ্ট।’

৪১ বছর বয়সী আম্মার রাজি বলেন, কঠিন পরিস্থিতির কারণে তিনি ও তার পরিবার ‘বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছেন’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছয়টি সন্তান, এর মধ্যে দু’জন খুব ছোটৃ আমি শঙ্কিত, আমরা হয়তো আর ফিরতে পারব না।’ রাজি ছয় বছর আগে উত্তরাঞ্চলীয় নিজ শহর মানবিজে সংঘর্ষ থেকে পালিয়েছিলেন।

সিরীয় সেনাবাহিনী জানায়, আলেপ্পোর শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়েহ এলাকায় সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর ‘সব সামরিক অবস্থানই বৈধ সামরিক লক্ষ্য’।

কুর্দিদের শীর্ষ কর্মকর্তা ইলহাম আহমদ দামেস্কের বিরুদ্ধে কুর্দিদের ওপর ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধ’ চালানোর অভিযোগ তুলে সিরীয় সরকারকে ‘সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে বিবেচনার পথ অনুসরণের’ আহ্বান জানান।

কুর্দি কর্তৃপক্ষকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে মার্চের চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এটি বাস্তবায়নের কথা ছিল।

কুর্দিরা বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থার পক্ষে চাপ দিচ্ছে, তবে সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এপ্রিল মাসে কুর্দি যোদ্ধারা এলাকা ছাড়তে সম্মত হলেও শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়েহ এখনো এসডিএফ-সংশ্লিষ্ট কুর্দি ইউনিটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

কুর্দি নিরাপত্তা বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, সেনাবাহিনীর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরপরই তারা ‘ট্যাংক ব্যবহার করে প্রথম অনুপ্রবেশের চেষ্টা’ প্রতিহত করেছে।

তারা অভিযোগ করে, ‘দামেস্ক সরকারের গোষ্ঠীগুলো কামান ও ট্যাংক দিয়ে নিরাপদ আবাসিক এলাকায় গোলাবর্ষণ করছে।’

অন্যদিকে সিরীয় কর্তৃপক্ষ এসডিএফের বিরুদ্ধে সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামলার অভিযোগ তোলে।

কর্তৃপক্ষ আলেপ্পো বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট স্থগিত ঘোষণা করেছে। শহরের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি দপ্তরও বন্ধ রাখা হয়েছে।

সরকার-নিয়ন্ত্রিত সিরিয়াক কোয়ার্টারের বাসিন্দা ৫৩ বছর বয়সী গৃহিণী জুদ সেরজিয়ান বলেন, এই সহিংসতা ‘আমাদের যুদ্ধের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে’।

তিনি বলেন, ‘যাওয়ার আর কোথাও নেই, তাই আমরা আমাদের ঘরেই থাকব।’

মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সহায়তায় এসডিএফ সিরিয়ার উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর আঞ্চলিক পরাজয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দামেস্কে কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনের প্রতিনিধি আবদুল করিম ওমর এএফপিকে বলেন, আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলো ‘সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ’।

তিনি এসব এলাকা থেকে গোলাবর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এলাকাগুলো কুর্দি নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, ‘যাদের কাছে কেবল হালকা অস্ত্র রয়েছে’।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে ২০১৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখলের আগে আলেপ্পোতে বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই হয়েছিল।

২০২৪ সালে ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন আকস্মিক অভিযানে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হন।