শিরোনাম

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতা ডেলসি রদ্রিগেজ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তাঁর দেশ কোনো বিদেশি শক্তির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না। কারাকাস শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কোটি কোটি ব্যারেল তেল তুলে দেবে- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন ঘোষণার প্রাক্কালে তিনি এ কথা বললেন। কারাকাস থেকে বর্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
ক্ষমতাচ্যুত নেতা নিকোলাস মাদুরোর সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেলসি রদ্রিগেজ। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কতটা সহযোগিতায় তিনি প্রস্তুত—এ নিয়ে তাঁর বক্তব্যে দ্বিধা দেখা গেছে। কখনো সমঝোতার সুর, কখনো আবার কঠোর অবস্থান।
কারাকাসে নাটকীয় অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ধরে নেওয়ার তিন দিন পর রদ্রিগেজ বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার সরকারই দেশটিকে চালাচ্ছে। অন্য কেউ নয়।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা কোনো বিদেশি এজেন্ট দ্বারা শাসিত নয়।’
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন, ক্যারিবীয় দেশটির দায়িত্ব এখন ওয়াশিংটনের হাতেই। তবে তিনি বলেছেন, রদ্রিগেজ তাঁর শর্ত মানলে সহযোগিতায় প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র। শর্ত একটাই ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবেশাধিকার দিতে হবে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির তেলসম্পদ নিয়ে নিজের অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প ছিলেন চোখে পড়ার মতোই সরাসরি। মঙ্গলবার গভীর রাতে নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে তিনি ঘোষণা দেন, রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত উচ্চমানের তেল হস্তান্তর করবেন।
ট্রাম্প লেখেন, এই তেল বাজারদরে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ তাঁর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তিনি জানান, জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইটকে তিনি অবিলম্বে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
রদ্রিগেজ একদিকে সমঝোতার বার্তা দিলেও অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনী ও আধাসামরিক শক্তির কঠোরপন্থীদের পাশে রাখার চেষ্টা করছেন। মাদুরো গ্রেফতাারের পর থেকেই তারা রাস্তায় টহল দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক জাতি, যারা আত্মসমর্পণ করি না। আমরা এমন এক জাতি, যারা হাল ছাড়ি না।’
মার্কিন হামলায় নিহতদের তিনি ‘শহীদ’ আখ্যা দেন।
নিহতদের স্মরণে দেশে সাত দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী মঙ্গলবার জানায়, মার্কিন হামলায় ২৩ জন সেনা নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন জেনারেল।
ঘনিষ্ঠ মিত্র কিউবাও আলাদাভাবে ৩২ জন কিউবান সেনার মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ করেছে। এদের অনেকেই ছিলেন মাদুরোর নিরাপত্তা দলের সদস্য।
এই অভিযানে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করেনি ভেনেজুয়েলা। অভিযানে মার্কিন বাহিনী মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী ফ্লোরেসকে ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায় বিচারের মুখোমুখি করতে।
অ্যাটর্নি জেনারেল তারেক উইলিয়াম সাব মঙ্গলবার বলেন, বেসামরিক ও সামরিক মিলিয়ে ‘কয়েক ডজন’ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
মাদুরো দম্পতির পক্ষে হাজার হাজার সমর্থক কারাকাসে মিছিল করেন। তাঁদের মুক্তির দাবি তোলা হয়। মিছিলে ছিলেন প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোও।
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের আশঙ্কায় মাদুরোর বহু সমালোচক তাঁর পতনে প্রকাশ্যে আনন্দ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে সোমবার নিউইয়র্কের একটি আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তাঁরা মাদক পাচারসহ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তাঁরা ন্যায়বিচার পান।
রদ্রিগেজ চেষ্টা করছেন কাবেলো ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভøাদিমির পাদ্রিনো লোপেজের সঙ্গে ঐক্য দেখাতে। এই দু’জনকেই মাদুরো প্রশাসনের মূল ক্ষমতাধর হিসেবে দেখা হয়।
তবে ওয়াশিংটনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সতর্কবার্তা দেন।
তিনি বলেন, ‘ডেলসি রদ্রিগেজ নির্যাতন, নিপীড়ন, দুর্নীতি ও মাদক পাচারের অন্যতম স্থপতি।’
মাচাদোর দাবি, ‘তিনি রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে প্রধান যোগাযোগ করে থাকেন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনি বিশ্বাসযোগ্য নন।’
নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোরতা এখনো বহাল থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। সোমবার ভেনেজুয়েলায় ১৬ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে আটক করা হয় বলে সাংবাদিক ইউনিয়ন জানিয়েছে। পরে সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের এজেন্ডা মানতে ব্যর্থ হলে তাঁকে ‘মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হবে।’
সামরিক বাহিনীর সাবেক এক শীর্ষ জেনারেল মনে করছেন, রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ খাত মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য খুলে দেবেন। একই সঙ্গে ২০১৯ সালে মাদুরোর সময় ছিন্ন হওয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিতে পারেন।
তিনি আরো বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা প্রশমিত করতে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিও দেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের বলেন, ‘মাদুরো ছিলেন একজন সহিংস মানুষ, যিনি লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছেন।’
তিনি দাবি করেন, রদ্রিগেজ প্রশাসন কারাকাসের একটি নির্যাতনকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে।
সংবিধান অনুযায়ী, মাদুরো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুপস্থিত ঘোষণা করা হলে—যা ছয় মাস পর হতে পারে—এর ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাচাদো বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী বিরোধীরাই। তাঁর দাবি, ভোট হলে তারা ‘৯০ শতাংশেরও বেশি ভোট’ পাবে।