বাসস
  ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:১২
আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১২

ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে মার্কিন অভিযান, প্রেসিডেন্ট মাদুরো আটক

ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী। ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মধ্যরাতে বোমা হামলা ও বিশেষ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ট্রাম্প একে ‘অসাধারণ’ সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন।

কারাকাস খেকে এএফপি এ খবর জানায়।

এই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে মাসের পর মাস ধরে চলা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার অবসান ঘটে। 

মার্কিন সমর্থিত ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো—যিনি গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পান—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার ক্ষণ এসে গেছে।’ তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়াকে ‘অবিলম্বে’ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না- তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

মাদুরোর বামপন্থি সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ফ্রান্স সতর্ক করে বলেছে, ভেনেজুয়েলার সংকটের কোনো সমাধান বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

এএফপি সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোর আনুমানিক ২টার দিকে (গ্রিনিচ মান সময় ০৬টা) কারাকাসবাসী বিস্ফোরণের শব্দ ও সামরিক হেলিকপ্টারের গর্জনে ঘুম ভাঙে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিমান হামলায় একটি বড় সামরিক ঘাঁটি ও একটি বিমানঘাঁটিসহ একাধিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

এই বোমা হামলা ছিল ৬৩ বছর বয়সী মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার একটি বৃহত্তর অভিযানের অংশ। সেখানে তিনি মাদক পাচারসংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হবেন।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা একটি ‘দুর্গ’ থেকে মাদুরোকে আটক করেছে। অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা নিহত না হলেও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পুরো অভিযানটা দেখেছি একেবারে টেলিভিশন শো দেখার মতো। গতি আর সহিংসতা দেখে আমি বিস্মিত।’ তিনি এটিকে ‘অবিশ্বাস্য’ ঘটনা বলে বর্ণনা করেন।

অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর কারাকাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। সরকারি ভবনের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং বাতাসে পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

মাদুরোকে নিউইয়র্কে নেওয়ার প্রস্তুতি

ট্রাম্প জানান, প্রথমে হেলিকপ্টারে করে মাদুরোকে উদ্ধার করা হয় এবং বর্তমানে তাকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর আক্রমণ জাহাজ ‘আইও জিমা’-তে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে তাকে নিউইয়র্কে পাঠানো হবে।

মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বলেন, মাদুরো ও তার স্ত্রী মাদক ও সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত অভিযোগে ‘আইনের পূর্ণ কঠোরতা’র মুখোমুখি হবেন।

২০১৩ সালে হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসা মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে আসছিলেন। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাদকজনিত মৃত্যুর জন্য ভেনেজুয়েলা দায়ী এ কারণেই এই অভিযান ‘ন্যায্য’।

ভেনেজুয়েলায় এখন কী হবে—তা স্পষ্ট নয়। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। কাউকে হুট করে দায়িত্ব দিয়ে ঝুঁকি নিতে পারি না।’ তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিতে ‘গভীরভাবে জড়িত’ থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও একাধিক ইউরোপীয় দেশ আগে থেকেই মাদুরোর বৈধতা স্বীকার করে না। তাদের দাবি, তিনি ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন কারচুপি করেছেন। তবে ট্রাম্প মাচাদো ক্ষমতায় আসবেন কি না—সে বিষয়ে কিছু বলেননি।

‘ওরা বোমা ফেলছে!’

অভিযানের আগেই ভেনেজুয়েলাবাসী হামলার আশঙ্কা করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডসহ বড় নৌবহর উপকূলে অবস্থান করছিল।

কারাকাসের দক্ষিণে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় সামরিক কমপ্লেক্স ফোর্ট তিউনা এবং উত্তরের কারলোতা বিমানঘাঁটি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। রাজধানীর উত্তরে লা গুয়াইরা অঞ্চলেও হামলা চালানো হয়, যেখানে প্রধান বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর অবস্থিত।

কারাকাসের বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী ফ্রান্সিস পেনা এএফপিকে বলেন, ‘আমি ঘুমাচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার বান্ধবী চিৎকার করে বলল: ওরা বোমা ফেলছে!’

লা গুয়াইরার ৫৮ বছর বয়সী মারিয়া ইউজেনিয়া এস্কোবার বলেন, ‘বিস্ফোরণে মনে হচ্ছিল আমি বিছানা থেকে উঠে যাচ্ছি। আমি ভাবলাম—যে দিনটির ভয় ছিল, সেটাই এসে গেছে, আর আমি কেঁদে ফেললাম।’

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র আবাসিক এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে এবং তারা ‘বৃহৎ সামরিক মোতায়েন’ ঘোষণা করেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

তেল, মাদক ও অভিবাসন

ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে সামরিক তৎপরতার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন: অবৈধ অভিবাসন, মাদক পাচার ও তেল শিল্প তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ভেনেজুয়েলার তেল খাতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সক্রিয়।

তিনি প্রকাশ্যে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানাননি, যদিও শনিবার জানান—গত সপ্তাহেই তিনি মাদুরোর সঙ্গে কথা বলে তাকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

অভিযানের বৈধতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন। তবে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাইক জনসন একে ‘নির্ণায়ক ও ন্যায্য’ বলে মন্তব্য করেন।

চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা কার্যত বন্ধ, নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জব্দের নির্দেশ দেয়। সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারবিরোধী অভিযানের নামে মার্কিন হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে বলে মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় ইরান, কিউবা ও কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন। স্পেন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।