বাসস
  ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৩৮
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:১০

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলকে দুই বছরের মধ্যে স্বাধীন করার ঘোষণা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের

ঢাকা, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ইয়েমেনের সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা শুক্রবার দুই বছরের মধ্যে স্বাধীন করার প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। 

তবে একই দিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। 
দক্ষিণ ইয়েমেনজুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিযানের লাগাম টানতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী সামরিক কর্মকর্তা ও চিকিৎসা সূত্র জানায়, দুটি সামরিক ঘাঁটিতে চালানো বিমান হামলায় ২০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। এসময় একটি বিমানবন্দর ও আরও কয়েকটি স্থাপনাকে লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়।

এই বোমাবর্ষণ ও আকস্মিক স্বাধীনতা ঘোষণার পেছনে রয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চলমান উত্তেজনা। বিশেষ করে, দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)-এর সাম্প্রতিক ভূখণ্ড দখল অভিযানকে কেন্দ্র করেই দুই মিত্র দেশের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে।

১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেন উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই অংশে বিভক্ত ছিল। 

এসটিসি’র স্বাধীনতা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দুই বছরের মধ্যেই দেশটি আবার বিভক্ত হতে পারে। নতুন রাষ্ট্রের নাম হবে ‘দক্ষিণ আরবিয়া’।

এসটিসি’র প্রেসিডেন্ট আইদারোস আলজুবাইদি বলেন, এই রূপান্তরকালীন পর্যায়ে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সংলাপ হবে, যা বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোটেরও আয়োজন করা হবে।

তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো সংলাপ না হয় বা আবার দক্ষিণ ইয়েমেনে হামলা চালানো হয়, তাহলে এসটিসি ‘অবিলম্বে’ স্বাধীনতা ঘোষণা করবে।

টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে আলজুবাইদি বলেন, ‘দক্ষিণ ও উত্তর ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ আয়োজনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে কাউন্সিল।’

গত মাসে এসটিসি বাহিনী তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই সৌদি আরব সীমান্তঘেঁষা সম্পদ সমৃদ্ধ হাদরামাউত প্রদেশের বড় অংশ ও ওমান সীমান্তবর্তী মাহরা প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে এসটিসি’র সাম্প্রতিক অভিযান রিয়াদকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দুই শক্তিকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করায়।

টানা সতর্কতাবার্তা ও চলতি সপ্তাহে একটি কথিত ইউএই অস্ত্রবাহী চালানে বিমান হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট শুক্রবার ব্যাপক হামলা শুরু করে।

হাদরামাউত উপত্যকা ও মরুভূমি অঞ্চলে এসটিসি’র প্রধান মোহাম্মদ আবদুল মালিক বলেন, আল-খাশা সামরিক শিবিরে সাতটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

এ ছাড়া ওই অঞ্চলের অন্যান্য স্থাপনা এবং সাইয়ুন শহরের বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা হয়েছে বলে এসটিসি’র সামরিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এএফপিকে জানিয়েছে।

আল-খাশার কাছে একটি গ্রামের বাসিন্দা রেয়াদ খামেস বলেন, ‘সৌদি বিমানগুলো এসটিসি যোদ্ধাদের তাড়া করছে। আমরা জানি না যে এগুলো কী ধরনের বিমান। শুধু আগুনের ঝলকানি আর বিস্ফোরণ দেখি। এগুলো চেকপয়েন্টে আঘাত করছে এবং (সৌদি-সমর্থিত) বাহিনীর অগ্রযাত্রার পথ পরিষ্কার করছে।’

এসটিসি’র অভিযান শুরুর পর এটিই প্রথম সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় প্রাণহানির ঘটনা।

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামরিক মুখপাত্র বলেন, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তারা একটি ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’ জড়িত। 
তিনি এটিকে উগ্র ইসলামবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেন, আর এই উগ্র ইসলামবাদ দীর্ঘদিন ধরেই ইউএই’র একটি প্রধান উদ্বেগ।

এই বিমান হামলাগুলো এমন এক সময়ে চালানো হয়, যখন সৌদি-সমর্থিত বাহিনী হাদরামাউতে সামরিক স্থাপনার ‘শান্তিপূর্ণ’ দখল নিতে অভিযান শুরু করে।

হাদরামাউতের গভর্নর এবং ওই প্রদেশের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর প্রধান সালেম আল-খানবাশি বলেন, ‘এই অভিযান যুদ্ধ ঘোষণা নয়, কিংবা উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো চেষ্টা নয়।’

সাবা নেট সংবাদ সংস্থার বরাতে এ কথা জানানো হয়।

এদিকে, সৌদি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে হামলাগুলো সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটই চালিয়েছে। 

এই জোট ২০১৫ সালে ইয়েমেনের উত্তরে হুতি বিদ্রোহীদের হটানোর লক্ষ্যে গঠিত হয়। যদিও সেই প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেনি।

সৌদি সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সতর্ক করে জানায়, ‘দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল দুটি প্রদেশ থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত, হামলা বন্ধ করা হবে না।’

ইরান-সমর্থিত হুতিদের উৎখাতের লক্ষ্যে গঠিত সামরিক জোটের মূল ভিত্তি ছিল উপসাগরীয় ধনী রাষ্ট্রগুলো। 
হুতিরা ২০১৪ সালে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের অধিকাংশ জনবহুল এলাকা দখল করে সরকারকে উৎখাত করে।

তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পরও হুতিরা ক্ষমতায় টিকে আছে। 

অন্যদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

ইয়েমেনের এডেনভিত্তিক সরকার বিভিন্ন গোষ্ঠীর জোট, যার মধ্যে এসটিসিও রয়েছে। 

এরা সবাই হুতি বিদ্রোহীদের বিরোধিতায় একত্রিত হলেও, নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

২০১৯ সালে ইয়েমেন থেকে অধিকাংশ সেনা প্রত্যাহার করে নেয় ইউএই। 

চলতি সপ্তাহে মুকাল্লা বন্দরে কথিত অস্ত্রবাহী চালানে জোটের বিমান হামলার পর যদিও ইউএই এই চালানে অস্ত্র থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বাকি সেনাও প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছে দেশটি।

শুক্রবার ইউএই সরকারের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, সব সেনা ইয়েমেন ছেড়ে গেছে। 

তিনি বলেন, আবুধাবি ‘সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন ও আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শান্তির টেকসই পথ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’