শিরোনাম

ঢাকা, ১ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল স্কি রিসোর্ট ক্রাুঁমোঁতানায় নববর্ষ উদযাপনের সময় বৃহস্পতিবার ভোরে ভিড়ভাট্টা একটি বারে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়লে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা পরিস্থিতিকে ‘আতঙ্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সুইজারল্যান্ডের ক্রাঁ-মোঁতানা থেকে এএফপি ভীতসন্ত্রস্ত প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানায়, আগুন থেকে বাঁচতে অনেকে বারের জানালা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন, আর দগ্ধ শরীর নিয়ে অনেকে রাস্তায় ছুটে আসছিলেন।
নববর্ষের প্রথম প্রহরে আগুন লাগার পর পুলিশ, দমকল বাহিনী ও উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। আগামী ৩০ জানুয়ারি থেকে যেখানে স্কি বিশ্বকাপ আয়োজনের কথা রয়েছে—সেই জনপ্রিয় রিসোর্টেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।
‘আমি হতভম্ব,’ সুইস রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএসকে বলেন আলেক্সি লাগ্যুয়ের।
১৮ বছর বয়সী এই তরুণ বন্ধুদের একটি দলের সঙ্গে জনপ্রিয় ‘লে কঁস্তেলাসিওঁ’ বারের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় ভেতর থেকে ধোঁয়া ও আগুন বের হতে দেখেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেন।
‘মানুষ আগুনের ভেতর দিয়েই দৌড়াচ্ছিলৃ জানালা ভাঙতে চেয়ারে ভর করে আঘাত করছিল।’
দক্ষিণ-পশ্চিম সুইজারল্যান্ডের ভালাই ক্যান্টনের পুলিশ কমান্ডার ফ্রেদেরিক গিসলার সাংবাদিকদের জানান, ‘ডজনখানেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে’, আর প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন—যাদের অনেকের অবস্থাই গুরুতর।
দুই তরুণী ফরাসি নাগরিক এমা ও আলবান ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভিকে বলেন, আগুন লাগার পরপরই তাঁরা বারের ভেতরের ‘আতঙ্ক’ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্যাম্পেন বোতলের ওপর রাখা ‘জন্মদিনের মোমবাতি’ ছাদের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
‘কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো ছাদে আগুন ধরে যায়,’ তাঁদের একজন বলেন। তাঁর ধারণা, সে সময় ভেন্যুতে প্রায় ২০০ জন ছিলেন, যাদের বেশিরভাগের বয়স ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।
নিউইয়র্ক থেকে আসা এক পর্যটক, যিনি বারের ভেতর থেকে উজ্জ্বল কমলা রঙের আগুন বেরিয়ে আসার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন, এএফপিকে জানান, তিনি মানুষকে দৌড়াতে ও চিৎকার করতে দেখেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানায়, রাত ১টা ৩০ মিনিটের কিছু আগে (০০৩০ জিএমটি) আগুন লাগার কারণ এখনও তদন্তাধীন। তবে এটি কোনো ‘হামলা’ ছিল বলে তারা মনে করে না।
ভালাই অঞ্চলের প্রধান হাসপাতালে জরুরি বিভাগ ভরে যাওয়ায় আহতদের সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
কিস্টোন-এটিএস সংবাদ সংস্থা জানায়, উত্তর সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ডজনখানেক আহতকে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গুরুতর দগ্ধ অন্তত ২২ জনকে লোজানের প্রধান হাসপাতালে এবং ছয়জনকে জেনেভায় পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সুইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া গি পারম্যাঁল্যাঁ ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ ট্র্যাজেডি’ বলে আখ্যা দেন।
এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, ‘যা আনন্দের মুহূর্ত হওয়ার কথা ছিল, তা ক্রাুঁমোঁতানায় বছরের প্রথম দিনটিকে শোকে পরিণত করেছে, যার প্রভাব পুরো দেশ ও দেশের বাইরেও পড়েছে।’
সুইস কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের জানান, নিহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো এখনও খুব তাড়াতাড়ি।
তবে তারা স্বীকার করেছে, বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে ক্রাঁ-মোঁতানার জনপ্রিয়তার কারণে নিহতদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অন্তত দুইজন ফরাসি নাগরিক আহত হয়েছেন।
ক্রাুঁমোঁতানার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ‘লে কঁস্তেলাসিওঁ’ বারে ৩০০ জনের ধারণক্ষমতা রয়েছে, আর বারান্দায় আরও ৪০ জনের জায়গা আছে।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও বারের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এবং জানালাগুলো ভাঙা ছিল।
ভালাই ক্যান্টনের প্রধান কৌঁসুলি বিয়াত্রিস পিলু বলেন, ‘নিহতদের শনাক্ত করা এবং যত দ্রুত সম্ভব তাঁদের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে উল্লেখযোগ্য সম্পদ ও জনবল নিয়োজিত করা হয়েছে।’
প্রাথমিক প্রতিবেদনে আগুন লাগার পেছনে বড় ধরনের বিস্ফোরণের কথা বলা হয়েছিল।
তবে ভালাইয়ের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান স্তেফান গানজার বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, বিস্ফোরণটি আসলে আগুনের ফলেই ঘটেছে।’
কৌঁসুলি পিলু জোর দিয়ে বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই সন্ত্রাসী হামলা নয়।’
এদিকে ২১ বছর বয়সী আলেক্স আরটিএসকে জানান, তিনি একটি বিকট শব্দ শোনার কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
গ্যাসের তীব্র গন্ধ ও গলিত প্লাস্টিকের গন্ধে আচ্ছন্ন পরিবেশে তিনি দেখেন দগ্ধ শরীর নিয়ে মানুষ বার থেকে বেরিয়ে আসছে এবং ‘সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে’।
তিনি আরও বলেন, ভবনটির বড় একটি বেজমেন্ট থেকে ওপরে ওঠার জন্য মাত্র একটি সরু সিঁড়ি ছিল- এ কথা মনে পড়ে যাওয়ায় তাঁর আশঙ্কা হয়, কয়েক ডজন মানুষ হয়তো ভেতরেই আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
‘ভাবনাটা আমার শিরদাঁড়া দিয়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিল,’ তিনি বলেন।