শিরোনাম

রেদ্ওয়ান আহমদ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ২৬ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস রচিত হয়েছে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তঝরা অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ জন বীর সন্তান নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও হয়ে আছে এক গৌরবের উজ্জ্বল অধ্যায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৬ জন শহীদ হন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন একজন শিক্ষক, ১২ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য, তাদের একজনকে রাষ্ট্রীয় বীরত্ব পদক ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবেও ভূষিত করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত দলিলপত্রে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস উঠে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের চেইনম্যান মোহাম্মদ হোসেন।
তিনি গণবাহিনী (সেক্টর-১)-এর অধীনে নৌ-কমান্ডো হিসাবে যুদ্ধে অংশ নিয়ে ছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৬ মে তিনি কর্ণফুলী নদীতে নিজ শরীরে লিম্পেট মাইন বেঁধে পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংসের অভিযানে শহীদ হন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত শহীদ আবদুর রব ছিলেন তৎকালীন চাকসু’র (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী।
শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেন।
১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল তেমনি একটি প্রশিক্ষণার্থী দলকে রামগড় পৌঁছে দেওয়ার পথে পাকিস্তানি বাহিনীর অ্যামবুশে তিনি শহীদ হন।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক ছিলেন দর্শন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক অবনী মোহন দত্ত।
তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে নিজের বাড়ি থেকে খাবার সরবরাহ করতেন এবং শত্রুপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতেন।
১৯৭১ সালের ৮ মে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে হত্যা করে।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ফরহাদ উদ-দৌলা মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরে মেজর জিয়ার অধীনে যুদ্ধ করেন।
আলবদর বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে তিনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত শহীদ হন।
বাণিজ্য অনুষদের মেধাবী ছাত্র খন্দকার এহসানুল হক আনসারিও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
পাকিস্তানি বাহিনী তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল মনসুর ছিলেন মুক্তিবাহিনী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর আলবদর বাহিনী তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন— বাংলা বিভাগের মনিরুল ইসলাম খোকা, মোহাম্মদ হোসেন ও মোস্তফা কামাল, অর্থনীতি বিভাগের নাজিম উদ্দিন খান ও আবদুল মান্নান, ইংরেজি বিভাগের আশুতোষ চক্রবর্তী, সমাজতত্ত্ব বিভাগের ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ ও গণিত বিভাগের ভুবন।

এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও দুই জন শহীদ হন।
তাদের মধ্যে ছিলেন—বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রভাস কুমার বড়ুয়া ও আলাওল হলের প্রহরী ছৈয়দ আহমদ।
এই ১৬ জন শহীদের আত্মত্যাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
এই ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে, মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ মুখে জিরো পয়েন্ট চত্বরে স্মৃতিস্তম্ভ স্মরণ এবং ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের সামনে নির্মাণ করা হয় স্বাধীনতা স্মৃতি ম্যুরাল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শহীদ বীর যোদ্ধাদের কীর্তি, আত্মত্যাগ ও অবদানকে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গর্বের জায়গা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং অনেকে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।’
মোহাম্মদ আল-ফোরকান আরও বলেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী এই শহীদেরা আমাদের থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরপরই ইতিহাস বিভাগের শিক্ষকদের বিশেষভাবে ডাকবো এবং তাদের সঙ্গে বসে দেখবো যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস ও তাদের অবদানকে নিয়ে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে কাজ করা যায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, ৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. আজিজুর রহমান মল্লিকের (এ আর মল্লিক) সভাপতিত্বে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়েছিল।
২৪ মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থনে সাবেক ছাত্র সমিতির আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে আয়োজন করা হয় গণসঙ্গীত।
২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দখল করে এবং টানা নয় মাস তাদের ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করে।
পাকিস্তানি সেনারা এখানে তাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বানিয়েছিল।
পরবর্তীতে যুদ্ধের শেষে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাফর ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান চালায় এবং ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের নয় দিন পর, ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শত্রুমুক্ত হয়।