শিরোনাম

ঢাকা, ১৯ মে, ২০২৬ (বাসস) : ঊনচল্লিশ বছরের রাফিজা আক্তার (ছদ্মনাম) একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করেন। স্বামী আর তিন সন্তান নিয়ে থাকেন নগরীর পল্লবী এলাকায়। স্বাভাবিকভাবেই চলছিল তাদের জীবন।
কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তার মাসিকের একটু ঝামেলা হচ্ছে। একবার মাসিক হওয়ার বারো তেরো দিন পর আবারো রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে খুব চিন্তায় আছেন রাফিজা। স্বামীর সাথে আলোচনা করলেও তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। বলেছেন, মাঝে মাঝে এমন হতে পারে। এ নিয়ে কোন নারী কলিগের সাথেও আলোচনা করেননি তিনি।
একসময় সহ্য করতে না পেরে শরণাপন্ন হন চিকিৎসকের। তিনি বেশ কিছু পরীক্ষা দেন। সেগুলো করার পর জানা যায় রাফিজা জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবে তা প্রথম স্টেজে।
বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সারের পর জরায়ুমুখ ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হন নারীরা। প্রতি বছর নয় হাজারের বেশি নারী নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় ছয় হাজার মারা যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা এই রোগ প্রতিরোধে এইচপিভি টিকা এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এ ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য।
দেশে জরায়ুমুখ ক্যান্সার (সার্ভিক্যাল ক্যান্সার) প্রতিরোধে দেশব্যাপী স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা বাড়ানো, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকার আওতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, লোকলজ্জা এবং দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে প্রতিরোধযোগ্য সত্ত্বেও দেশে এই রোগে মৃত্যু হার বাড়ছে।
প্রতি বছর জানুয়ারি মাস ‘জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা মাস’ হিসেবে পালিত হয়। সাধারণত ৩৫ থেকে ৪৫ বছরের নারীরা বেশি আক্রান্ত হন, তবে বর্তমানে কম বয়সী নারীরাও ঝুঁকিতে আছেন।
গাইনোলজিষ্ট ডা. মনোয়ারা বেগম বলেন, দু’বার মাসিকের মাঝের সময়টায় রক্তক্ষরণ হওয়া অস্বাভাবিক। স্বাভাবিকভাবেই নারীর মাসিক চক্রের সময়টা একেবারে নির্দিষ্ট থাকে না। দু’তিন দিন এদিক-ওদিক হতেই পারে। কিন্তু এ রকম দুটি চক্রের মাঝের কোনো সময় রক্তক্ষরণ হলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মেনোপজের পর যে কোনো সময় রক্তক্ষরণ হওয়াটাও অস্বাভাবিক।
তিনি বলেন, নারীদের জন্য জরায়ুমখ ক্যান্সার একটি নীরব ঘাতক। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে জরায়ুমুখ ক্যান্সার থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠা সম্ভব। প্রাথমিক অবস্থায় যেসব উপসর্গ থাকে, সেসব জানা থাকলে একজন নারী দ্রুততম সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন। ফলে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুর্বিষহ জটিলতা থেকে বেঁচে যেতে পারেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, জরায়ুমুখ থেকে অস্বাভাবিক স্রাব নিঃসরণ হওয়াও ক্যান্সারের লক্ষণ। এই ক্যান্সার হলে গোলাপি, লালচে, বাদামি কিংবা মলিন বর্ণের স্রাব দেখা দিতে পারে। বিশেষত মেনোপজের পর এ ধরনের স্রাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক সময় জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কোমরব্যথা হতে পারে। কোমর টেনে ধরে রাখার মতো একটা কষ্টদায়ক অনুভূতিতে ভুগতে পারেন ক্যান্সার আক্রান্ত নারী। তাছাড়া জরায়ুমুখের আশপাশেও ব্যথা হতে পারে।
তিনি বলেন, অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি ক্যান্সার আক্রান্ত একজন নারীর অস্বাভাবিক ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে।
ডা. মনোয়ারা বলেন, এসব লক্ষণের যে কোনোটি দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
তিনি বলেন, জরায়ুমুখ ক্যান্সার আক্রান্ত বহু নারীর কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণই থাকে না। তাই সবচেয়ে জরুরি বিষয় স্ক্রিনিং। এটি আপাতদৃষ্টে সুস্থ ব্যক্তির দেহে ক্যান্সারের উপস্থিতি খোঁজার প্রক্রিয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩০ বছর বয়স থেকেই একজন নারীর জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং শুরু করা প্রয়োজন। কেবল এর মাধ্যমেই জরায়ুমুখ ক্যান্সারের জটিলতা থেকে অধিকাংশ রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। তাই প্রতিটি পরিবারে এ বিষয়ক সচেতনতা গড়ে তোলা আবশ্যক।
আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেলী নার্গিস বলেন, ‘মানুষকে বুঝতে হবে যে এটি কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং একটি প্রতিরোধ ও নিরাময়যোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা।’
তিনি জানান, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এই ক্যান্সার নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।