বাসস
  ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪০

সচেতনতা দিয়েই জরায়ুমুখের ক্যান্সার রোধ সম্ভব 

ঢাকা, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) :  বর্তমান বিশ্বে নারীর জরায়ুমুখের  ক্যান্সার  এক মরণঘাতী রোগ। অথচ একটু সচেতন হলেই এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।  

আশার কথা এই রোগ বিষয়ে কেবল বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বই এখন অনেক বেশি সচেতন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জানুয়ারি ‘জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা’ মাস হিসেবে পালিত হয়।

এই ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়ে থাকে। কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে নারীদের ক্যান্সারজনিত কারণে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ জরায়ুমুখের ক্যান্সার। ২০২০ সালে বিশ্বে ছয় লাখের বেশি নারী এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ নারীই মারা যান। এই সময়ে বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ২৬৮ জন, মারা গেছেন ৪ হাজার ৯৭১ জন।

জরায়ুমুখে ক্যান্সার খুব ধীরে ধীরে হয়। তবু দেশের নারীদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। বিশেষ করে সমাজের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার এবং শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসর নারীরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে সহজে ও খুব কম খরচে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার রোগ শনাক্ত করা যায়। 

প্রথমেই ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে এ রোগ থেকে পুরোপুরি নিরাময় হওয়া যায়। রোগের পর্যায় যত বাড়তে থাকে, রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনা ততই কমতে থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো, জরায়ুমুখের ক্যান্সার কেন হয়? এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ গাইনি অনকোলজিস্ট ডা.ফারহানা তারান্নুম খান বলেন, ‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস(এইচপিভি) গোত্রের একটি ভাইরাস জরায়ুমুখ ক্যান্সারের জন্য দায়ী। এই ভাইরাস যৌন সংসর্গের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়।’

ক্যান্সারের ঝুঁকির ফ্যাক্টরগুলো সম্পর্কে তিনি জানান, বাল্যবিবাহ বা কম বয়সে সহবাস, অধিক সন্তান ধারণ এবং ঘন ঘন সন্তান প্রসব অন্যতম কারণ। এ ছাড়া বহুগামিতা, ধূমপান, দীর্ঘদিন এক নাগাড়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন, নারী প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ এবং এইডস আক্রান্তদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি বেশি।

প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। সে জন্যই নারীদের স্ক্রিনিং জরুরি। তবে সহবাসের পর রক্তক্ষরণ, মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় রক্তপাত শুরু হওয়া, অনিয়মিত বা অতিরিক্ত রক্তস্রাব, সাদা স্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত বা চাল ধোয়া পানির মতো স্রাব ইত্যাদি। এছাড়াও তলপেটে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, হাড়ে ব্যথা, যোনিপথ দিয়ে প্রস্রাব বা পায়খানা নির্গত হওয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনটা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। 

তবে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ জন্য প্রতিষেধক গ্রহণ করতে হবে। ৯ থেকে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত এইচপিডি টিকা দেওয়া যাবে। যৌন মিলনের আগেই এই টিকা নেয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকর। টিকাটির তিনটি ডোজ রয়েছে। ১৫ বছরের আগে দেওয়া সম্ভব হলে দুটোতেই প্রতিরোধ সম্ভব। বাংলাদেশে সরকার বিনামূল্যে কিশোরীদের এই টিকা দিচ্ছে।

অন্যান্য ক্যান্সারের সঙ্গে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের বড় একটি পার্থক্য হলো, এটি ক্যান্সার  পূর্ব অবস্থায়ই নির্ণয় করা সম্ভব। এতে পুরোপুরি  ক্যান্সার হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাতে একজন মেয়ে তার স্বাভাবিক নারীত্ব বজায় রাখতে পারে। একইসঙ্গে ব্যয়বহুল ক্যান্সার  চিকিৎসা ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

স্ক্রিনিংয়ের জন্য এইচপিডি ডিএনএ টেস্ট, প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট এবং ভায়া টেস্ট করতে হয়। এই টেস্টগুলো অত্যন্ত কার্যকর এবং সহজলভ্য। সরকার ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সি নারীদের ভায়া টেস্টের সুবিধা দিচ্ছে। 

জেলা শহরগুলোতে প্যাপ টেস্ট এইচপিডি শনাক্তকরণের ব্যবস্থা আছে। টিকা দিলেও স্ক্রিনিং টেস্ট করতে হবে। এই টেস্টগুলো ৩ থেকে ৫ বছর পর পর করা হয়ে থাকে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের নারীরা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অ্যাডভান্সড স্টেজে বা অনেক দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান। অনেক ক্ষেত্রেই যখন আর সফল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই এ বিষয়ে কুসংস্কার ও সংকোচ পরিহার করতে হবে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসা হিসেবে সার্জারি, রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়। তবে এটা নির্ভর করে রোগটি কোন পর্যায়ে ধরা পড়েছে তার ওপর। এই চিকিৎসাগুলো বেশ ব্যয়বহুল এবং যন্ত্রণাদায়ক। তাই প্রতিরোধ ও আগেভাগে এ রোগ নির্ণয় করার দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।