শিরোনাম
ঢাকা, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চিহ্নিত ৬১টি শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য বাধার মধ্যে ৪৮টি সফলভাবে নিরসন করেছে বাংলাদেশ। অবশিষ্ট বাধাগুলোও দ্রুত সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইইউ’র সঙ্গে বহুল প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক আলোচনা শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে।
আজ রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, গত মার্চে ইইউ রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরে। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তড়িৎ পদক্ষেপে এসব সমস্যার বড় অংশ নিরসন করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সমাধান হওয়া প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স নবায়ন জটিলতা দূর করা, বাণিজ্যিক নমুনার বার্ষিক আমদানি সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলারে উন্নীত করা এবং রপ্তানি পণ্যের গতিপথ ট্র্যাকিংয়ে ব্যবহৃত ‘স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ড’-এর শুল্কায়ন জটিলতা নিরসন করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ।
এলডিসি উত্তরণে ইইউ’র সহযোগিতা কামনা :
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সুপারিশ ইতিবাচকভাবে এসেছে। এটি আগামী জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হবে। এ ক্ষেত্রে ইইউ’র শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নীতিগত সমর্থন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এফটিএ আলোচনায় ইইউ’র ইতিবাচক সাড়া :
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইইউ’র সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলে চলতি সপ্তাহ থেকেই এ বিষয়ে যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও ইইউ’র অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় থাকলে উভয় পক্ষই লাভবান হবে।
বাংলাদেশ ও ইইউ’র মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক ও আকাশপথের যোগাযোগ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ‘এয়ারবাস’ ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা দ্রুত ত্বরান্বিত হওয়ার আশাবাদও ব্যক্ত করেন ইইউ রাষ্ট্রদূত।
জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় আমদানি সিদ্ধান্ত :
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং জনগণের চাহিদাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই যেকোনো বাণিজ্যিক ও আমদানি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তিনি বলেন, জ্বালানি (বিশেষ করে এলএনজি) এবং খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দর, পণ্যের গুণগত মান ও পরিবহন অপচয়ের হার বিশ্লেষণ করেই সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে।
বাণিজ্যমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক নীতি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা শক্তির প্রভাবে পরিচালিত নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণই সরকারের সব সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইইউ’র সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধসহ সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতগুলোতে নতুন বাজার ও বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য বাধাগুলো সম্পূর্ণ দূর হলে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত আদান-প্রদান আরও গতি পাবে।