বাসস
  ৩০ জুন ২০২৬, ২৩:৪৬

মূল সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রেখে সতর্ক মুদ্রানীতি ঘোষণা বাংলাদেশ ব্যাংকের

ঢাকা, ৩০ জুন, ২০২৬ (বাসস) : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের গতি অব্যাহত রাখতে ২০২৬ সালের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য সতর্ক ও সংকোচনমূলক (কনট্র্যাকশনারি) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময়ের জন্য নীতিগত রেপো সুদহার (পলিসি রেপো রেট) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ ব্যাংক সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন।

গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। তাই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখবে।

তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মে মাসে কমে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কঠোর নীতিগত অবস্থান বজায় রাখা হবে।

নতুন মুদ্রানীতিতে নীতিগত রেপো সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

গভর্নর বলেন, বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা থেকে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেল ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য আমদানিনির্ভর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।

দেশীয় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে গভর্নর জানান, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্বৃত্ত তারল্যের বড় একটি অংশ বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা দিতে এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে কৃষি, কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর মধ্যে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

গভর্নর বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করছে।

এসব সংস্কারের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬ ও ডিপোজিট প্রোটেকশন আইন-২০২৬ বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থ ব্যবহার ছাড়াই খেলাপি সম্পদ নিষ্পত্তির জন্য ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট (ডামা) চূড়ান্ত করা, আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) কাঠামো চালু এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক-বেইজড সুপারভিশন) আরও শক্তিশালী করা।

তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হবে। 

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।