বাসস
  ১৮ মে ২০২৬, ২১:২৭

রপ্তানিতে পিছিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা; জটিল নীতি ও সুবিধা না জানাই বড় বাধা

ঢাকা, ১৮ মে, ২০২৬ (বাসস) : দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) বড় একটি অংশ এখনো রপ্তানি বাজারের বাইরে রয়ে গেছে। জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, নীতিগত জটিলতা এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তাদের রপ্তানি সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকেরা।

গত শনিবার ঢাকায় বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) আয়োজিত ‘স্টাডি অ্যান্ড ন্যাশনাল কনফারেন্স অন এসএমই কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড এক্সপোর্ট গ্রোথ’ শীর্ষক এক ভ্যালিডেশন কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে। কর্মশালায় শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), এসএমই ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন, উদ্যোক্তা ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।

কর্মশালায় উপস্থাপন করা বিল্ডের গবেষণায় বলা হয়, ছয়টি নন-আরএমজি খাতের ১০৭টি এসএমই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৩ দশমিক ১ শতাংশ সরাসরি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। অথচ জরিপে অংশ নেওয়া কোনো প্রতিষ্ঠানই কখনো বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ব্যবহার করেনি।

গবেষণায় আরও উঠে আসে, মাত্র ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ এসএমই ‘এসআরও-৩৮৪’ সম্পর্কে জানে। আর ৮২ দশমিক ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও এসআরও-৩৮Ñদুই সুবিধা সম্পর্কেই অবগত নয়। ফলে সরকার ঘোষিত এসব নীতিগত সুবিধা বাস্তবে উদ্যোক্তাদের বড় অংশের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, দেশে অনেক এসএমইর রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু জটিল প্রক্রিয়া ও সুবিধা পাওয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। তিনি রপ্তানিমুখী এসএমই উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিসহায়তার ওপর জোর দেন।

বিল্ডের গবেষণায় বলা হয়, উচ্চ ভ্যাট, ব্যয়বহুল কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা, জামানতনির্ভর ঋণ, বিদ্যুতের ঘাটতি ও প্রশাসনিক জটিলতা এসএমই খাতের রপ্তানিযোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে। তবে প্রায় ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ অ-রপ্তানিকারক এসএমই বলেছে, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল সুবিধা ও সহজতর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা চালু হলে তারা রপ্তানিতে আগ্রহী হবে।

আলোচনায় বিভিন্ন শিল্প ক্লাস্টারের উদ্যোক্তারা নিজ নিজ খাতের সংকট তুলে ধরেন। কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী কুমারখালী হোম টেক্সটাইল ক্লাস্টারের প্রতিনিধিরা কাঁচা তুলার আমদানি শুল্ক কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি প্রশিক্ষণের দাবি জানান। 

ভৈরবের জুতা খাতের উদ্যোক্তারা দক্ষ জনবল তৈরি ও কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (সিএফসি) প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিনিধিরা উচ্চ সুদহার, ভ্যাট, বিদ্যুৎ সংকট এবং রপ্তানি সহায়তার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুলতানা ইয়াসমিন বলেন, এসএমই নীতির কার্যকর বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ এসএমই ডেটাবেইস ও এসএমই সূচক তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ইপিবির মহাপরিচালক বেবী রানী কর্মকার বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ও মূল্য সংযোজনকারী এসএমই পণ্যের প্রচারে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জানান, ইপিবি এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নিতে প্রশিক্ষণ, ভিসা সহায়তা ও ভ্রমণ সুবিধা দিয়ে সহায়তা করছে। 

তিনি আরও বলেন, উদ্ভাবনী ও ব্যতিক্রমী পণ্য থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াও নারী উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা শিখা বলেন, এসএমই, নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও শিল্প ক্লাস্টারের জন্য পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণের সুদহার ৭ শতাংশ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ঋণের ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে এ খাতে ঋণ বিতরণ আশানুরূপ হয়নি। গত বছর মোট ঋণের মাত্র ১৮ শতাংশ এসএমই খাতে গেছে, যা চলতি বছরে আরও কমেছে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত পুনঃঅর্থায়নের লক্ষ্যও পূরণ হয়নি উল্লেখ করে  হোসনে আরা শিখা বলেন, মোট ৬৭৯ বিলিয়ন টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও গত বছর এর মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। 

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার সংস্কার, সহজ অর্থায়ন, কমপ্লায়েন্স সহায়তা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান।