শিরোনাম

ঢাকা, ১৮ মে,২০২৬ (বাসস) : দেশে অবৈধ তামাকপণ্যের বাজার দ্রুত বাড়ছে। এতে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। বিদ্যমান তামাক করব্যবস্থায় সংস্কার এবং আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত ‘কমব্যাটিং ইলিসিট সিগারেট ট্রেড টু প্রটেক্ট পাবলিক রেভিনিউ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা উপস্থাপন ও সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার ও গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার ২০২৪-২৫ সময়ে বাংলাদেশের অবৈধ সিগারেট বাজারের চিত্র তুলে ধরেন।
মূল উপস্থাপনায় ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক ধূমপায়ী কম দামের ও কর ফাঁকি দেওয়া পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে গত এক বছরে অবৈধ তামাকপণ্যের বাজার আরও বড় হয়েছে।
তিনি বলেন, সিগারেটের চাহিদা তুলনামূলকভাবে অনমনীয়। অর্থাৎ দাম বাড়লেও মানুষ ধূমপান পুরোপুরি ছাড়ে না। তবে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হলে অনেকে বৈধ সিগারেটের বদলে অবৈধ পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
‘অপটিমাল ট্যাক্সেশন’ বা সর্বোত্তম করহার ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট সীমার পর কর বাড়ালে তা উল্টো ফল দিতে পারে। এতে বৈধ বাজার সংকুচিত হয় এবং অবৈধ বাজার সম্প্রসারিত হয়, ফলে সরকারের প্রত্যাশিত রাজস্বও বাড়ে না।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে সিগারেটের ওপর মোট করের বোঝা প্রায় ৮৩ শতাংশ। এর মধ্যে সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, অবৈধ তামাকপণ্যের বিস্তারের কারণে ২০২৫ সালে সরকারের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০৬ শতাংশ বেশি।
তিনি জানান, পর্যালোচনাধীন সময়ে বৈধ সিগারেটের ব্যবহার ৭৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন শলাকা থেকে কমে ৬১ দশমিক ৩ বিলিয়ন শলাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন শলাকা কমেছে।
তবে মোট সিগারেট ব্যবহার কমেছে মাত্র ২ দশমিক ২ বিলিয়ন শলাকা। ৮০ দশমিক ৬ বিলিয়ন থেকে তা নেমে এসেছে ৭৮ দশমিক ৪ বিলিয়নে। গবেষকদের মতে, বৈধ বিক্রি কমে যাওয়ার বড় অংশই অবৈধ পণ্য দিয়ে পূরণ হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, অবৈধ সিগারেটের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন শলাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৭ বিলিয়নে পৌঁছেছে। একই সময়ে সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন দামের নিচে বিক্রি হওয়া সিগারেটের পরিমাণ ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ১০ বিলিয়নের বেশি হয়েছে।
গবেষকেরা বিদ্যমান অ্যাড ভ্যালোরেম করব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতি শলাকা বা প্রতি প্যাকেটভিত্তিক নির্দিষ্ট কর কাঠামো চালুর সুপারিশ করেন। তাদের মতে, ইউরোপ ও জাপানসহ অনেক দেশে এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
এ ছাড়া চার স্তরের সিগারেট মূল্য কাঠামো ও ফ্লোর প্রাইস যৌক্তিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে বৈধ পণ্য অবৈধ বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
গবেষণায় বড় করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অধীনে কেন্দ্রীয় তামাক কর প্রশাসন গঠন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সমন্বয়ে বহুমাত্রিক টাস্কফোর্স গঠন এবং কারখানাভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থার নজরদারি জোরদার করার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া সরকার নির্ধারিত দামের নিচে সিগারেট বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার কথাও বলা হয়।
আলোচনায় বিড়ি, জর্দা ও গুলের মতো তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রিত তামাকপণ্যের দিকেও ধূমপায়ীদের ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়।