বাসস
  ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪০
আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫৩

আড়াইশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামের লালদিঘি

নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত লালদিঘি। ছবি: বাসস

॥ আবু মোশাররফ ॥

চট্টগ্রাম, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস)- নগরায়ণের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের ফলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গত দুই দশকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে হাজারো পুকুর ও জলাশয়। সেসব জায়গায় গড়ে উঠেছে বড় বড় দালান। কোথাও কোথাও ঐতিহাসিক পুকুর বা দিঘির নামে এলাকার পরিচিতি টিকে থাকলেও, সেই জলাশয়ের শেষ চিহ্নটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।

তবে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত লালদিঘি এর ব্যতিক্রম। দীর্ঘ আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে এই দিঘি। আর এর টিকে থাকার পেছনে রয়েছে দিঘিটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিবিড় মেলবন্ধন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের দেওয়ানি বা শাসনভার লাভের পর একটি ছোট পুকুর থেকে বৃহৎ দিঘিতে পরিণত হওয়া এই জলাশয়কে ঘিরে এ অঞ্চলে নানা কিংবদন্তিও প্রচলিত রয়েছে।

চারপাশে প্রাচীর ও ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথ নির্মাণের মাধ্যমে নতুন রূপে সাজানো ‘লালদিঘি পার্ক’ এখনো নগরবাসীর অবসর যাপন ও খোলা আকাশের নিচে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার নিবিড় আশ্রয়।

লালদিঘি এলাকা চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫২’র ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের গণসমাবেশের স্মৃতি বহন করে চলেছে লালদিঘি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উপাখ্যানও।

সব মিলিয়ে লালদিঘি শুধু একটি জলাধার নয়, এটি বন্দরনগরীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতীকী স্থান। চট্টগ্রামের প্রাচীন নগরকেন্দ্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক এতটাই গভীর যে লালদিঘির নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে বন্দরনগরীর রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নাগরিক জীবনের অবসর যাপনের এক চেনা চিত্র।

লালকুঠির ছায়ায় রক্তবর্ণ হয়ে উঠত দিঘির পানি-

চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র আন্দরকিল্লার অদূরে ২ দশমিক ৭০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত লালদিঘি। এর উত্তর-পশ্চিম পাশে রয়েছে বাণিজ্যিক কেন্দ্র আন্দরকিল্লা, পূর্ব পাশে চট্টগ্রাম কারাগার এবং দক্ষিণ পাশে জেলা পরিষদ ভবন ও ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দান।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার লাভ করে। সে সময় ‘এন্তেকালী কাছারি’, অর্থাৎ জমিসংক্রান্ত তহসিল অফিসে—বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদর দপ্তর—লাল রঙ করা হয়েছিল। এ কারণে ভবনটি লোকজনের কাছে ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

লালকুঠির পূর্ব দিকে ছিল জেলখানা। সেটিও লাল রঙ করা হয় বলে তা একসময় ‘লালঘর’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বলা হয়, ভবন দুটি লাল পাগড়ি পরিহিত ব্রিটিশ পাহারাদাররা পাহারা দিতেন। অনেকের মতে, এ কারণেই ভবনগুলোর নাম লালঘর ও লালকুঠি করা হয়েছিল।

এই ভবনগুলোর পাশেই ছিল একটি ছোট পুকুর। প্রচলিত আছে, বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ত, তখন লালকুঠির ছায়ায় পুকুরের পানি রক্তবর্ণ ধারণ করত। সেই দৃশ্য থেকেই স্থানীয়রা জলাশয়টিকে ‘লাল পুকুর’ বা ‘লালদিঘি’ নামে অভিহিত করতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ শাসকরা পুকুরটি আরও বড় করে দিঘিতে পরিণত করে।

লালদিঘির উত্তর পাশে রয়েছে একটি মসজিদ, যার বর্তমান নাম লালদিঘি শাহী জামে মসজিদ। মসজিদটির গম্বুজে ১৯৩৯ সাল এবং তকী ইসমাইল মুহাম্মদের নাম লেখা রয়েছে। যিনি ছিলেন রাউজান উপজেলার চিকদাইর গ্রামের একজন জমিদার ।

অবসর সময়ে তিনি সেসময় খোলামেলা লালদিঘির পাড়ে সময় কাটাতেন এবং দিঘিটির অভিভাবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দিঘিটির মালিকানা মুসলিম হাই স্কুলের হাতে তুলে দেন।

ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে উত্তর-দক্ষিণ সড়ক নির্মিত হওয়ার পর মিউনিসিপ্যাল ময়দান দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এর পূর্ব অংশ সাধারণ মানুষের খেলার মাঠে পরিণত হয়। পরে মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে মাঠটি বিদ্যালয়টির খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে এই মাঠ লালদিঘির মাঠ নামে পরিচিত।

কিংবদন্তী আছে- ‘অনেক খুনে লাল লালদিঘির পানি’ :

লালদিঘিকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে একটি চমৎকার কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে। রূপকথার মতো সেই গল্পটি অনেকটা এমন—
একবার এক দিনমজুরের মেয়ে লালদিঘিতে গোসল করতে নামলে হঠাৎ তার পায়ে শিকল বেঁধে তাকে পানির নিচে রূপকথার দেশের এক বাদশার দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেই বাদশার বিয়ে ঠিক হয়েছিল কোনও এক ‘লাল বেগম’ এর সঙ্গে। কিন্তু তিনি এক ক্রীতদাসের সঙ্গে পালিয়ে গেলে, বিষয়টি না জেনেই বাদশার কাছে লাল বেগমের ভূমিকায় অভিনয় করতে দিনমজুরের মেয়েটিকে ধরে আনা হয়। পরবর্তীকালে এক কথোপকথনে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেলে ক্রুদ্ধ হয়ে বাদশা আসল লাল বেগমকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।

পরে জানা যায়, লাল বেগম আন্দরকিল্লার দিঘি থেকে দুশ হাত দূরে পর্তুগিজদের কিল্লায় অবস্থান করছেন। এরপর বাদশা সেই কিল্লা আক্রমণ করেন। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, যুদ্ধে এত রক্তপাত হয়েছিল যে দিঘির পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। তবে সেই যুদ্ধে বাদশা পরাজিত হন এবং সবাই পালিয়ে যায়। তবুও লাল বেগমকে উদ্ধারের আশায় বাদশা নাকি দিঘির পাড়েই থেকে যান।

আরেকটি ধারণা প্রচলিত আছে লোকমুখে। ইংরেজ শাসনামলে এক লাল মেমসাহেবের নির্দেশে অথবা তার স্মরণে এই দিঘিটি খনন করা হয়েছিল। সেই থেকেই নামকরণ হয় ‘লালদিঘি’।

ইতিহাস যাই বলুক, আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা লালদিঘি নগরবাসীর কাছে আজ মুক্ত আকাশ ও নির্মল বাতাসে কিছুটা সময় কাটানোর এক নির্ভরতার জায়গা। ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহলের মাঝখানে এক টুকরো প্রকৃতি আর জলাশয়ের ধারে প্রতিদিনই অনেকে আসেন কিছুটা অবসর কাটাতে।

নগরীর পাথরঘাটা থেকে সকালে লালদিঘির ওয়াকওয়েতে হাঁটতে আসা আল মাহবুব আকরাম বাসস’কে বলেন, ‘শহরে এখন খোলা জায়গা নেই বললেই চলে। লালদিঘি পার্কের মতো একটা জায়গা আমাদের জন্য অনেক বড় স্বস্তি। সকালে এখানে হাঁটতে এলে শরীরচর্চার পাশাপাশি মনটাও ভালো হয়ে যায়।  নিয়মিত আধাঘণ্টা হাঁটা আর একটু নির্মল বাতাস নেওয়ার জন্য জায়গাটা আমার খুব পছন্দের।’

সিরাজুদ্দৌলা সড়কের সাব-এরিয়া থেকে আসা রুহেল মো. কায়কোবাদ বলেন, ‘বিকেলে কাজের চাপ শেষে এখানে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকলে সারাদিনের ক্লান্তি অনেকটাই কেটে যায়। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই, কখনো শুধু চুপচাপ বসে মানুষের চলাচল দেখি। এত ব্যস্ত একটা শহরের মাঝখানে খোলা আকাশের নিচে বসার এমন জায়গা থাকা সত্যিই দরকার।’

কেসি দে রোডের বাসিন্দা মো. আলমগীর বলেন, ‘লালদিঘিতে আসলে শুধু একটা পার্কে আসা হয় না, মনে হয় চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি অংশের কাছে এসেছি। এই জায়গাকে ঘিরে এত গল্প, এত আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতি রয়েছে। এখন আমরা এখানে হাঁটি, শরীরচর্চা করি, সময় কাটাই। পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখে জায়গাটিকে আরও সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বাসস’কে বলেন, ‘লালদিঘির মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলো আমাদের নগরীর ঐতিহ্যের অংশ। এসব জায়গার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, নগরবাসী যেন স্বস্তিতে হাঁটতে পারেন, শরীরচর্চা করতে পারেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতে পারেন এবং নির্মল পরিবেশে একটু শ্বাস নিতে পারেন।’

চট্টগ্রামকে বাসযোগ্য ও নান্দনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে উন্মুক্ত জায়গাগুলো সংরক্ষণ ও পরিকল্পিতভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নগরীর যেসব খালি জায়গা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে আছে, সেগুলোও চিহ্নিত করে সংস্কার করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এসব জায়গায় সবুজায়ন, হাঁটার পথ ও বসার স্থানসহ নাগরিকদের অবসর ও শরীরচর্চার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘লালাদিঘি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নাগরিকদের সচেতনতা ও ভালবাসা পেলে আরও বহুবছর ধরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিলিয়ে যাবে লালদিঘি।’

সব মিলিয়ে, ইতিহাস ও কিংবদন্তির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে লালদিঘি আজও চট্টগ্রামের নগরজীবনের এক জীবন্ত অংশ। একদিকে এটি বন্দরনগরীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতিবাহী প্রতীক, অন্যদিকে ব্যস্ত নগরবাসীর জন্য প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে নেওয়ার উন্মুক্ত পরিসর। ইতিহাসের এই স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নাগরিক পরিসর হিসেবে লালদিঘিকে আরও সমৃদ্ধ করাই হতে পারে আগামী দিনের প্রত্যাশা।