শিরোনাম

রুস্তম আলী মন্ডল
দিনাজপুর, ৭ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : জেলা শহর ও সদর উপজেলায় একসাথে ৫টি ঐতিহ্যবাহী সাগর তথা রাজদিঘী রয়েছে। যা বছরের পর বছর দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে অনেক নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুসহ নানা বয়সের অসংখ্য লোকজনকে তারা হত্যা করে এই জুলুম সাগর নামক দিঘীতে ফেলে দিত। দিনাজপুরবাসী জুলুম সাগর পাড়ে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য সকল শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন।
সম্প্রতি দিনাজপুরবাসী ও সুধী জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের দাবি এসব সাগরের নামে দিঘীগুলোর ঐতিহাসিক নিদর্শন সরকারিভাবে দেখা-শোনা ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সাগরগুলোর জৌলুস ও ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে প্রায় বিলুপ্তির পথে এক সময়ের রাজ শাসন আমলের মোগল সম্রাটের ভারতীয় উপমহাদেশের ২৪টি পরগনার মধ্যে দিনাজপুর জেলার মধ্যে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক পরগনা যা ঘোড়াঘাট উপজেলায় অবস্থিত ঘোড়াঘাট দুর্গ নামে পরিচিত।
জনশ্রুতি রয়েছে মোগল সম্রাটের শাসনামলে এই জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলায় অবস্থিত ঘোড়াঘাট পরগনার দুর্গ করতোয়া নদীর তীরে প্রায় সাড়ে ৩শ’ একর ভূমির ওপরে অবস্থান ছিল বিশাল ঘোড়াশালা।
এখানে মোগল সম্রাটের সৈনিকেরা ঘোড়াচারণ করতো এবং ঘোড়াগুলোকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে গড়ে তোলা হতো। এই ঘোড়াশালা থেকেই দিল্লিতে পাঠানো হতো এসব যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ঘোড়া গুলোকে। সেই ঘোড়াশালা এখন তত্ত্বাবধান না থাকায় বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয় লোকজনের দাবি, ঐতিহাসিক এই ঘোড়াঘাট পরগনা ও ঘোড়াচারণের দুর্গ সরকারি তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা হলে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক এসব ঐতিহাসিক স্থান থেকে ইতিহাসের অনেক বিষয় অবগত হতে পারবেন। এজন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ এবং ঐতিহাসিক স্থান গুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন জানান, মোগল সম্রাটের শাসনামলে দিনাজপুর সদর উপজেলায় দিঘীর আকৃতি এসব ৫টি সাগর তৎকালীন দিনাজপুরের রাজা ও তার অংশীদাররা এলাকার জনসাধারণের পানির চাহিদা মিটানোর জন্য বিশাল ভূমিতে খনন করে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে ছিলেন। এসব সাগরে সে সময়ের মানুষ পরিবারের লোকজন গোসলসহ খাবার পানির চাহিদা পূরণ করতো।
খরতাপ ও গরম মৌসুমে গবাদি পশু ও ছাগলদের এসব সাগরে গোসল করানো হতো। সব মিলিয়ে এ ৫টি সাগর দিনাজপুর সদর উপজেলার পানির চাহিদা পূরণ করত।
সাগরের বৈশিষ্ট্য ছিল সাগরের চতুষ্পার্শ্বে জন সাধারণের বসার জন্য মনোমুগ্ধকর ঘাট নির্মাণ করা হয়েছিল। এসব ঘাটের দু’পাশে শানবাদায় করা ছিল। সাগরে নামার জন্য পাকা সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই সিঁড়ি দিয়ে গোসল করার জন্য মানুষ সাগরে নামতো। মনোমুগ্ধকর পরিবেশে সকলেই গোসল করে তৃপ্তি সহকারে বাসায় ফিরত। এসব সাগরে গোসল করে সকলেই তৃপ্তি পেত।
এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসব সাগরে গোসল আর হয় না, মাছ চাষের ব্যবস্থা চলছে। তারপর অনেক যুবক শখের বশে এই সাগর গুলোতে গোসল করে থাকে। পিকনিকের মৌসুম গুলোতে দূর-দুরন্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা মনের আনন্দে গোসল করে ফিরে যায়।
তিনি বলেন, পর্যটকের আওতাভুক্ত করে এই ৫টি সাগরকে ব্যবহার করা হলে প্রতি বছর এসব সাগরগুলো থেকে বেশ ভাল পরিমাণের রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সাবেক নারী-শিশু বিশেষ জজ আদালতে পিপি অ্যাডভোকেট মো. আনিসুর রহমান চৌধুরী, দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুল হক ছুটু, দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোকসেদ আলী মঙ্গলিয়া, এছাড়া দিনাজপুর জিয়া পরিষদের অনেক প্রবীণ নেতৃবৃন্দ, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. শেখ সাদেক আলী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক ডাক্তার এটিএম জিল্লুর রহমানসহ অনেকেই দিনাজপুর এই ৫টি দীঘি প্রকৃতির সাগরকে খাস দখলে অবহেলায় না রেখে পর্যটনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে এ খাত থেকে মোটা অংকের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।
দিনাজপুর জিয়া পরিষদের নেতৃবৃন্দের অভিমত, পলাশীর যুদ্ধের কিছুদিন আগে মহারাজা রামনাথ (১৭৫০-৫৫) খনন করেছিলেন মানবসৃষ্ট দিঘী ঐতিহাসিক রামসাগর। ৭৭ একরের এই দৈত্যাকৃতি দিঘী নিয়ে আজ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে তাজপুর গ্রামে এটি অবস্থিত।
রামসাগরের নাম যারা জানেন, তারা অনেকেই জানেন না, রামসাগরের প্রাচীন দিঘী সুখসাগর ও মাতা-সাগর। এ দিঘী দ’ুটো খনন করেন মহারাজা সুখদেব। গত ১৬৭৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে 'মহারাজ' উপাধি পাওয়ার পর তিনি দিঘী দু’টো খননের উদ্যোগ নেন৷ রাজবাটীর ১শ’ মিটার পেছনে ২২ একরের সুখসাগর দিঘীটি তাঁর নামে। এটিকে বর্তমানে ইকোপার্ক করা হয়েছে।
সুখসাগরের পাশে আরেক বিরাট আকারে দিঘী খনন করে মহারাজ সুখদেব। এটি তাঁর মায়ের নামে উন্মুক্ত করেন। এর নাম হয় মাতাসাগর। ৪৫ একরের মাতাসাগর সূর্যাস্তের রাণী হয়ে ওঠে। টিলায়-বনে-পাখ-পাখালিতে হারিয়ে যায় শহুরে কোলাহল। দুর্ভাগ্যবশত অরক্ষিত থাকায় এই দিঘীটির পাড় কেটে নেয়া হচ্ছে বহু বছর ধরে। সুখসাগর ও মাতাসাগরের মাঝে ৩শ’ বছরের সংযোগ রাস্তাটি এখন কেটে জমি বানানো হয়েছে।
রাজা রামনাথ সস্ত্রীক সুখসাগর থেকে আনন্দ ভ্রমণে আসতেন বলে ৭ একরের দিঘীটির নাম করা হয়েছিল ‘আনন্দসাগর’। এটি বর্তমানে দিনাজপুর মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের পাশে অবস্থিত। এ দুই সাগরের একটি সংযোগ খাল ছিল, যা এখনো আছে। তবে নগরবাসীর বর্জ্যের অত্যাচারে নালায় পরিণত হয়ে সংযোগ হারিয়েছে। অরক্ষিত আনন্দ সাগরকে দখল করার চেষ্টা হচ্ছে বহুদিন থেকে।
দিনাজপুর গোড় এই শহীদ বড়মাঠের সম্মুখে অবস্থিত সার্কিট হাউস এলাকায় বিজিবি’র কৃষ্ণকলি ক্যাফের সাথে ‘জুলুমসাগর’। ৮৪৫ বিঘার এই দিঘীর নামকরণে রয়েছে ভিন্ন ইতিহাস। ইংরেজদের অকথ্য নির্যাতনে শহীদ শত শত লাশ ফেলা হয়েছে এই দিঘীতে । সে ধারা বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদাররা বধ্যভূমি বানিয়ে অসংখ্য মানুষ হত্যা করে শহীদদের মরদেহ ফেলেছে জুলুম সাগরে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন অত্যাচারে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিনাজপুর শহরের এই জুলুম সাগর। কিছুদিন আগে এখানে মাছ শিকার করতে গিয়ে জেলেরা মানুষের হাড়গোড় ও মাথার খুলি পেয়েছে। এখনো জুলুম সাগর থেকে জেলেদের জালে মানুষের হাড়গোড় ও মাথার খুলি চিহ্ন পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য ওই সব অত্যাচার নির্যাতনে শহীদদের এই জুলুম সাগর বধ্যভূমিতে কোনো স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়নি। তবে তাদের দাবি এখানে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্ণয় করা। তাহলেই কেবল ওইসব শহীদদের আত্মার শান্তি পাবে।
এছাড়াও রাজা প্রাণ নাথের খননকৃত প্রাণ-সাগর, যা ছিলো শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরেই। মানচিত্রের কাটাকুটিতে সেটি এখন পশ্চিম বঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর কুমারগঞ্জ থানার অংশের সম্পত্তি হয়ে গেছে।