শিরোনাম

জীতেন বড়ুয়া
খাগড়াছড়ি, ৫ মার্চ ২০২৬ (বাসস): জেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মসজিদের নাম খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীয় শাহী জামে মসজিদ। এটি দেশের মুসলিম স্থাপত্যের একটি অনন্য নিদর্শন। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় এর অবস্থান।
১৮৪০ সালে নির্মিত টিন সেডের এই মসজিদটি ১৫০ বছর পেরিয়ে এখন সুবিশাল পাকা মসজিদে রুপান্তরিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরি মসজিদটিতে নামাজ আদায়ে জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন মুসুল্লিরা। খাগড়াছড়িতে আসা পর্যটকরাও এ মসজিদ না দেখে যান না। পাহাড়ে অবস্থিত এই মসজিদকে ঘিরে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহ-অবস্থান বিরাজমান রয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছ, প্রয়াত তৎকালীন লাল মিঞা কারিগরের মেজ ছেলে প্রয়াত হাজী বাদশা মিঞা সওদাগরের একক প্রচেষ্টায় এই মসজিদটি ১৮৪০ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি তৎকালীন অবিভক্ত তিন পার্বত্য জেলার এক মাত্র ব্যক্তি যিনি রাঙামাটি জেলা থেকে সেই সময়ের ডিসি আলী হায়দরের সার্বিক সহযোগিতায় মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তাকে ব্যবসায়ী প্রয়াত হাজী মকবুল হোসেন সওদাগরসহ অনেকে সহযোগিতা করেছিলেন।
মসজিদটি খাগড়াছড়ি পৌর শহরের মাঝখানে অবস্থিত। সুবিশাল তিন তলা বিশিষ্ট নানা কারুকাজে সুসজ্জিত মসজিদ ভবন। সুউচ্চ মিনারটি আলোক সজ্জিত হওয়ায় আলুটিলা পাহাড় থেকে দাঁড়িয়ে দেখা যায় এ মসজিদ। শহরের ঠিকানাও চিহিৃত করা যায় সহজে এ মসজিদের মিনার দেখে। পুরনো এ মসজিদে সেই সময় থেকে অনেকেই মনোবাসনা পুরণের আশায় মানত করত। সকল ধর্মের মানুষ মনোবাসনা পূর্ণ করতে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করতো। হাজী বাদশা মিঞা সওদাগরের মৃত্যুর পর থেকেই তার বড় ছেলে হাজী মো. শাহ আলম এ মসজিদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন। এর পর তার বয়স হওয়ায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মরহুম বাদশা মিঞা সওদাগরের ভাতিজা হাজী মো. জাহেদুল আলম।
হাজী মো. জাহেদুল আলমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, মসজিদের নিজস্ব জায়গায় রয়েছে বেশ কয়েকটি মার্কেট। বিশাল এ মসজিদে একজন খতিবসহ আটজন লোকবল রয়েছেন। এখানে সকালে ছোটদের মক্তবে পড়ানো হয়। মসজিদে প্রায় ৫ হাজার লোকের এক সাথে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সুন্দর পরিপাটি ও নান্দনিক আলোক সজ্জায় সজ্জিত মসজিদটি রাতের বেলায় ঝিক ঝিক করে, যা এখানকার পর্যটক ও নানা ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে সৌন্দর্যের রুপ রেখা হিসেবে দেখা দেয়। নানা কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে এই মসজিদ।
মসজিদটির কারুকাজ দেখে কারও কারও ধারণা, এটি ইরানের মসজিদগুলোর আদলে বানানো। এর বাইরের দিকের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৯৫ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১০০ ফুট। নামাজ কক্ষটি বর্গাকার। মিনারে রয়েছে সুদৃশ্য কারুকাজ। মোট তিনটি গম্বুজ আছে। ভেতরে আছে বেশ কয়েকটি ঝাড়বাতি ও দেয়ালে মনোমুগ্ধকর নকশা। মসজিদে ইটের সঙ্গে পাথরের ব্যবহারও করা হয়েছে। দেয়ালের মাঝে পাথরের স্তম্ভ, ইটের গাঁথুনি চোখে পড়ার মতো। পূর্ব-দক্ষিণে আছে ওজুখানা ও শৌচাগার।
এখানে নামাজ পড়তে আসা মোহাম্মদ লেয়াকত সওদাগড় বলেন, খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীয় শাহী জামে মসজিদ একটি দর্শনীয় স্থান। দূর থেকে সুউচ্চ মিনার দেখলেই পথিক বুঝতে পারবেন যে, তিনি খাগড়াছড়ি শহরে চলে এসেছেন। মসজিদটি মুসলিমদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। এখানে নামাজ আদায় করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। জায়গাটিও নয়নাভিরাম। এখানে এলেই মন ভালো হয়ে যায়।
মসজিদ কমিটির সাবেক সভাপতি মো. জাহেদুল আলম বলেন, ‘আমি বেশ কয়েক বছর ধরে মসজিদটির দায়িত্বে ছিলাম। আগে আমার পূর্ব পুরুষরা এর দায়িত্বে ছিলেন। এই মসজিদের পেছনে আছে অনেক ইতিহাস। আগামী প্রজন্মের জন্য মসজিদটি সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
মসজিদের খতিব আবদুন নবী হক্কানী ও পেশ ইমাম মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা এখানে নামাজ আদায় করার পাশাপাশি ছবিও তুলে রাখেন। মসজিদটি জেলার সব চেয়ে পুরনো বলে ধারণা অনেকের।
এ মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসা মো. জহুরুল আলম জানান, মসজিদে নামাজ আদায় করে শান্তি পান তিনি। রমজানের সময় সবাই এক সাথে বসে ইফতার করা এ মসজিদের একটি রেওয়াজ ছিল, তবে গত তিন বছর ধরে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে মসজিদ পরিচালনায় থাকায় সর্বজনীনভাবে ইফতারির আয়োজন এখন আর করা হয় না।
গোলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান জাফর উল্ল্যাহ বাসসকে বলেন, তিনি তার দাদার কাছে শুনেছেন, মসজিদটি প্রতিষ্ঠার সময় খাগড়াছড়ি ছোট একটি বাজার ছিল। তখন খাগড়াছড়ি ছিল রামগড় মহাকুমার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি গ্রাম। যে গ্রামের বাজারে মুসলিম ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। তাদের আদি নিবাস ছিল চট্টগ্রামের রাংগুনিয়া ও রাউজান এলাকা।
তিনি বলেন, তারা রাঙামাটি, মহালছড়ি হয়ে চেঙ্গীর নদী দিয়ে নৌকা নিয়ে খাগড়াছড়ি আসতেন এবং বাণিজ্য করতেন ওই ব্যবসায়ীদের মধ্যে লালমিয়া কারিগড় এর সহযোগিতায় খাগড়াছড়ি জেলার চেংগী নদীর পাড়ে কাঠ ও শন দিয়ে বানানো হয় এ মসজিদটি। পরে টিনশেড ঘর থেকে নির্মাণ করা হয় বিল্ডিং। সর্বশেষ তিন তলা হয়েছে মসজিদটি। এখন মসজিদটির আয়তন প্রায় দশ হাজার বর্গফুট। টিনশেড বিল্ডিং থাকা অবস্থায় মসজিদটি বেশ কয়েক বার সংস্কার করা হয়। শুরুর দিকে ৩০-৪০ জন নিয়ে জামাত হতো। এখন খাগড়াছড়ি জামে মসজিদটিতে এক সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন প্রায় পাঁচ হাজার মুসুল্লি।
মসজিদের আয়ঃ এ মসজিদের নামীয় সম্পত্তিতে ২৮টি দোকান-প্লট আছে। যা হতে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় হয়। এ ছাড়া জুমার দিনের দান হতে বছরে আয় হয় ৬/৭ লাখ টাকা। দুই একর কৃষি জমি হতে আয় হয় ৩৫-৪০ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি খাগড়াছড়ি বাজারে মসজিদের একটি পুকুর আছে। সেখানে মাছ চাষ করা হয়। এছাড়া সরকারি ও ব্যক্তিগত অনুদানও আছে।