শিরোনাম

।। বিপুল ইসলাম।।
লালমনিরহাট, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : লালমনিরহাটের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা নিদাড়িয়া মসজিদ। প্রায় তিনশ’ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি। প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়ে মসজিদটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মসজিদের দেয়ালে সংরক্ষিত শিলালিপি সূত্রে জানা যায়, ১১৭৬ হিজরি সনে মুঘল সুবেদার মাসুদ খাঁ এবং তাঁর পুত্র মনছুর খাঁর তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হয়। নির্মাণসামগ্রী, গাঁথুনি ও নকশায় মুঘল স্থাপত্যরীতির সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এক কক্ষবিশিষ্ট মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট ও প্রস্থ ১৬ ফুট।
মসজিদের উপরিভাগে তিনটি গম্বুজ, চার কোনায় চারটি পিলার, সম্মুখে একটি প্রবেশদ্বার এবং বাম পাশে একটি দোচালা ঘর রয়েছে—যা স্টোররুম বা ইমামের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। সামনে রয়েছে বিশাল ঈদগাহ এবং উত্তর-পূর্ব কোনে একটি কবরস্থান। উত্তর দিকে ২০১৯ সালে একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়।
স্থানীয়দের মতে, মসজিদের বাম পাশে থাকা একটি বাঁধানো কবর সুবেদার মনছুর খাঁর হতে পারে। জনশ্রুতি রয়েছে, মনছুর খাঁ আল্লাহর কাছে মানত করেছিলেন—তাঁর দাঁড়ি গজালে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করবেন। পরে তাঁর মুখে তিনটি দাঁড়ি গজায় এবং সেই স্মারক হিসেবেই তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
‘নিদাড়িয়া’ নামটির সঙ্গে দাঁড়ির সম্পর্ক রয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। যদিও এ বিষয়ে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক তথ্য সীমিত।
মসজিদের মোয়াজ্জিন আনসার আলী বাসসকে বলেন, বাপ-দাদার মুখে শোনা এই কাহিনী এখনো এলাকায় প্রচলিত। স্থানীয় বাসিন্দা ফয়জার রহমান বলেন, মসজিদটি অত্যন্ত পুরোনো। ছাদে ফাটল ধরেছে, কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অনুমতি ছাড়া কোনো সংস্কার করা যায় না। জমির একটি বড় অংশ দখলে থাকায় সমস্যাও জটিল হয়েছে।
আরেক বাসিন্দা আমির হোসেন বাসসকে বলেন, দাদার কাছ থেকে শুনেছি, তাঁর দাদার আমলের আগেই মসজিদটি নির্মিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সময়ের ক্ষয়ে এটি নষ্ট হওয়ার পথে। আগে সংস্কারের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও কার্যকর অগ্রগতি নেই।
জানা যায়, মসজিদটির নামে প্রায় ১০ একর ৫৬ শতক জমি দান করা হয়েছিল। ওই জমি থেকে প্রাপ্ত অর্থে প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তবে বর্তমানে জমির একটি অংশ দখলমুক্ত না হওয়ায় মামলা চলমান রয়েছে।
রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কে লালমনিরহাটের বড়বাড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কিশামত নগরবন্দ মৌজায় অবস্থিত মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত প্রাচীন স্থাপনা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এখানে এসে নামাজ আদায় ও দোয়া করেন।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এইচ এম রকিব হায়দার বাসসকে বলেন, ঐতিহাসিক নিদাড়িয়া মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তালিকাভুক্ত। প্রাচীন এ মসজিদের সংস্কার ও বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনাটি টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও দখলমুক্তকরণ নিশ্চিত করা গেলে নিদাড়িয়া মসজিদ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।