বাসস
  ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:০৬

নতুন রূপে সাজছে রাণীনগরের পাখি পল্লী, দৃশ্যমান হচ্ছে ঝুলন্ত সেতু

ছবি: বাসস

মো. আয়নাল হক

রাজশাহী, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলা মাদুর তৈরির প্রধান উপকরণ পাতি ও ধান চাষে সমৃদ্ধ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হলেও দীর্ঘদিন ধরে এ উপজেলায় কোনো বিনোদনকেন্দ্র ছিল না। উৎসবের সময়ে পরিবার নিয়ে অবসর কাটানোর মতো কোনো বিনোদন কেন্দ্র ছিল না।

এই প্রয়োজন উপলব্ধি করে ২০২৪ সালের শেষের দিকে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাইমেনা শারমীন, তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের সার্বিক সহযোগিতায় রাণীনগর-আবাদপুকুর আঞ্চলিক সড়কের ঐতিহাসিক হাতিরপুল এলাকায় অবস্থিত রক্তদহ বিলের সঙ্গে সংযুক্ত রতন দাড়া খালকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

পরবর্তীতে পুরো রতন দাড়া খালকে মাছের অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। খালের দু’পাশের বৃহৎ গাছগুলোকে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে রেখে রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

প্রতিটি উৎসবে বিশুদ্ধ প্রকৃতিনির্ভর বিনোদনের খোঁজে হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটক পরিবার-পরিজন নিয়ে এ বিনোদনকেন্দ্রে ভিড় জমান। বর্ষা মৌসুমেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী রক্তদহ বিলে ছুটে আসেন জলরাশির মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে।

পরে বর্তমান ইউএনও রাকিবুল হাসান পাখি পল্লীকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন উদ্যোগ হলো- খালের দু’পাশে যাতায়াতের সুবিধার্থে একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ। পাখির উপস্থিতি বাড়াতে এলাকায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন পাখিবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।

মাছ চুরি প্রতিরোধ ও পাখি পল্লীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পর্যটন এলাকার বিভিন্ন অবকাঠামোতে বর্ণিল রঙে রাঙানোর কাজ চলছে। বিশেষ করে ঝুলন্ত সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, অনন্য এই ঝুলন্ত সেতু পাখি পল্লীতে আগত দর্শনার্থীদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।

এছাড়া পাখি পল্লীকে ঘিরে নতুন নতুন দোকান গড়ে উঠেছে, যা শতাধিক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙা হয়ে উঠেছে।

বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার কুন্দুগ্রাম গ্রামের পর্যটক মামুনুর রশীদ তালুকদার বলেন, প্রকৃতির সান্নিধ্যে পরিবারের সঙ্গে নিরিবিলি সময় কাটাতে এ পাখি পল্লীর বিকল্প নেই।

তিনি আরো বলেন, পাখি পল্লীর ধারাবাহিক উন্নয়ন একদিন দেশীয় পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে ঝুলন্ত সেতু এলাকায় পর্যটকদের আগ্রহ বহুগুণে বৃদ্ধি করবে। আসন্ন ঈদে দর্শনার্থীরা এখানে আরো বেশি বিনোদন উপভোগ করবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

স্থানীয় দোকানি শফিকুল ইসলাম বলেন, হাতিরপুল এলাকায় পাখি পল্লী নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিনই পর্যটকরা পাখি পল্লীতে আসেন। দুই ঈদ ও অন্যান্য উৎসবে হাজার হাজার দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। পাখি পল্লী স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতেও আধুনিকায়ন ও সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ইউএনও রাকিবুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সুন্দর দেশ। চিন্তা-ভাবনা সুন্দর হলে প্রতিটি স্থানই সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। 

তিনি বলেন, সমৃদ্ধ উপজেলা হওয়া সত্ত্বেও রাণীনগরে কোনো বিনোদনকেন্দ্র ছিল না। এ শূন্যতা পূরণে তিনি জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় পূর্বসূরিদের নেওয়া উদ্যোগগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, যান্ত্রিক দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরে পরিবারের সদস্যদের প্রকৃতির মাঝে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব কেন্দ্র গড়ে তোলাই পাখি পল্লী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য।

আসন্ন রমজানের আগে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ঝুলন্ত সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের বরাদ্দে প্রধান সড়কের পাশে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় ছাতা-আবৃত বসার স্থান নির্মাণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

এছাড়া অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একটি উন্মুক্ত মঞ্চ, গণশৌচাগার এবং ঝুলন্ত সেতু পর্যন্ত আলোকসজ্জা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা শিগগিরই বাস্তবায়ন হবে।

আসন্ন ঈদের আগেই ঝুলন্ত সেতু, রং করা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এবারের ঈদে পাখি পল্লীতে আগত দর্শনার্থীরা উপভোগ করবেন এক অনন্য সুন্দর ও মনোরম পরিবেশ। ভবিষ্যতেও রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।