বাসস
  ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:০০
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:২১

৩০০ বছরের ঐতিহ্য ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি মসজিদ

ছবি : বাসস

মুহাম্মদ আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বাসস): জেলার ভাটির জনপদ হিসেবে খ্যাত দিরাই-শাল্লা উপজেলা। আর এই উপজেলাগুলোতে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অপরূপ নিদর্শন হাওর-বাওর। এছাড়াও রয়েছে সুরম্য অট্রালিকা। আছে দিরাই উপজেলার জমিদার বাড়ি ও অপরুপ সৌন্দর্য্যের কারুকার্য্যে সন্নিবেশীত জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ।

তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের ভাটিপাড়া গ্রামে অবস্থিত। মসজিদের ভেতরে প্রতিদিন একসাথে শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। দিল্লির মসজিদের আদলে এটি ১৭ শতকের শেষের দিকে নির্মিত হয়। ৩০০ বছর ধরে দিরাই উপজেলায় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে আজও হাওরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি। ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি মসজিদ নামেই পরিচিত এই মসজিদটি।

জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ভাটিপাড়া জমিদারদের এলাকা ছিলো বর্তমানের দিরাই, জামালগঞ্জ, শাল্লা এবং তাহিরপুর এই চার উপজেলার বিশাল এলাকাজুড়ে। এইসব এলাকা মূলত হাওর কেন্দ্রিক। ভাটিপাড়ার মানুষদের কাছে জমিদার বাড়ির নাম ‘সাব বাড়ি’ বা সাহেব বাড়ি হিসেবে পরিচিত। ভাটিপাড়ার জমিদারদের উদ্যোগে দিল্লির জামে মসজিদের আদলে ভাটিপাড়া গ্রামে পিয়ান নদীর পাশে ৩০০ বছর পূর্বে ১৭ শতকের শেষের দিকে নির্মাণ করা হয় মসজিদটি। তবে স্থানীয় অনেকের ধারণা ১৮৩০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। চুন-সুরকির তৈরি এ মসজিদের ওপরে রয়েছে বিশাল আকারের তিনটি গম্বুজ। রয়েছে ছোট-বড় ১৬টি মিনার। সাদা মার্বেল ও সিরামিক পাথরে ফুল, লতাপাতা ও প্রকৃতির নান্দনিক নকশা ও কারুকাজ করা হয়েছে মসজিদের ভিতর ও বাইরের দেয়ালে। এছাড়াও মসজিদের বারান্দা, ছাদ, পিলার, গম্বুজ, মেঝেসহ সবখানে রয়েছে শৈল্পিক নির্মাণশৈলীর পরিচয়। এমন দৃষ্টিনন্দন কারুকাজে সাজানো মসজিদের সামনের অংশ মসজিদের ভেতরে প্রবশের জন্য আছে সাতটি দরজা, দরজার ওপর নজরকাড়া নকশা। মসজিদটির সামনে বিশাল পুকুর, পুকুরে নিস্তরঙ্গ পানির বুকে মসজিদের ছায়া। পুকুরের এই স্বচ্ছ পানি দিয়ে অযু করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।

হাওর ও পিয়াইন নদীর তীরে ১০ বিঘা জমির উপর নির্মিত ঐতিহাসিক এই মসজিদ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাটি অঞ্চলের মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্যের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমিদার ফতেহ মোহাম্মদ আলিফাত্তাহের একসময় এই বিশাল এলাকাজুড়ে জমিদারত্ব ছিল। তিনিই খরস্রােতা পিয়ান নদীর পাড়ে নির্মাণ করেন তিন গম্বুজওয়ালা বিশাল মসজিদটি। মসজিদটিতে কোনো ধরনের পাথর ও রড ব্যবহার করা হয়নি। কেবল ইট আর চুনাপাথরের আস্তরণ দিয়ে তৈরি করা হয়। এই মসজিদটি নির্মাণ করতে নদীর পাড়ে তিনটি ইটভাটাও স্থাপন করা হয়েছিল। যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে ইট তৈরি করে মসজিদের গায়ে স্থাপন করা হতো। 

আরো জানা যায়, ভারত থেকে হাতির পিঠে করে মসজিদের পাথরের আস্তরণ এনে ব্যবহার করা হয়েছিল। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ নির্মাণ করতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল। 

ভাটিপাড়া গ্রামের সাইদুর রহমানের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, মসজিদটির যখনই নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, তখনই চুনসুরকির আস্তর দেওয়া হতো, পরে সিমেন্ট আবিস্কারের পর পুরাতন আস্তর তুলে নতুন করে আস্তরের কাজ করা হয়। ওই সময় এক টাকায় তিন বস্তা সিমেন্ট পাওয়া যেত যা কলকাতা থেকে জাহাজে করে আনা হয়েছিল।

মসজিদে নামাজরত মুসল্লিরা বলেন, ভাটি অঞ্চলে এটাই একমাত্র পুরোনো মসজিদ এবং নান্দনিক নকশা ও কারুকাজ করা। মসজিদটিতে নমাজ পড়লে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। এর সৌন্দর্য্য যত দেখি, ততই ভালো লাগে বলে জানান তারা।

বিশিষ্ট আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এমন স্থাপত্যশৈলী নিদর্শন আমাদের বাঙ্গালী জাতির ঐতিহ্য। জাতীয় সম্পদ হিসেবে সরকারকে দেখভাল করার দাবি জানান তিনি।

সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বাসসকে বলেন, আমরা এইসব স্থাপত্য শিল্পের সংরক্ষণের জন্য কাজ করবো। এইসব আমাদের সম্পদ, রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।