বাসস
  ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:১৭

সুনামগঞ্জের তিন গম্বুজবিশিষ্ট রায়পুর বড় মসজিদ স্থাপত্যকলার এক বিস্ময়

ছবি : বাসস

মুহাম্মদ আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ (বাসস) : সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় রাজকীয় মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে স্থাপত্যকলার এক নিদর্শন রায়পুর বড় মসজিদ। জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের মহাশিং নদীর কূল ঘেঁষে দাড়িঁয়ে আছে স্থাপত্যকলার বিস্ময় নিদর্শন পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের বড় মসজিদটি।

সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের পার্শ্বে শত বছরের পুরনো স্থাপত্য নিদর্শন, মোগল প্রাসাদাকৃতির তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি দেখে যে কারো প্রাণ জুড়িয়ে যায়। মসজিদটি নির্মাণশৈলী ও অপূর্ব কারুকাজের জন্য বিখ্যাত। মসজিদটি রায়পুর বড় মসজিদ নামেও পরিচিত।

সরেজমিনে রায়পুর গ্রামে গিয়ে ইয়াসীন মির্জার প্রপৌত্র, পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হায়দারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে আমাদের পূর্ব পুরুষ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ছিলেন। আর এলাকার মধ্যে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ছিলেন ইয়াসীন মির্জা। ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতেন। ভ্রমণের সুবাদে বিভিন্ন জায়গার স্থাপত্যশৈলী দেখে তিনি এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

জগলুল হায়দার জানান, ১৯৩১ সালে এ মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। টানা দশবছর কাজ চলে। ইয়াসিন মির্জা কলকাতা ও দিল্লি থেকে স্থপতি ও নির্মাতা আনিয়েছিলেন। এরমধ্যে প্রধান স্থপতি ছিলেন মুমিন আস্তাগার। 

আর মুমিন আস্তাগার ছিলেন, তাজমহলের স্থপতিদের একজনের বংশধর। ওই সময়কালে মুমিন ঢাকাতে বসবাস করতেন। 

তিনি জানান, এই দ্বিতল স্থাপনাটি কোনো ধরনের রডের ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ ইটের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। দোতলা এই মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার, প্রস্থ ৫০ মিটার। গম্বুজের উচ্চতা ২৫ ফিট, দেয়ালের পুরুত্ব ১০ ফিট। 

মসজিদের ৩টি গম্বুজ ও ৬টি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। দোতলা এই ভবনের সামনে একটি বড় ঈদগাহ আছে। উত্তর দিকে একটি ফটক আছে। তৎকালীন সময়ে মসজিদটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ১০ লাখ টাকা।

নামাজের জন্য নির্ধারিত স্থান দোতলায়। মসজিদের দ্বিতীয় তলার মেঝেতে রয়েছে দুর্লভ শ্বেতপাথর, তার চারপাশের ব্লকে আরও বেশি দুর্লভ ব্ল্যাক স্টোন বা কালোপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো আনা হয়েছিল ভারতের জয়পুর থেকে। তখনকার সময় ভারতের সঙ্গে নদীপথের যোগাযোগ বেশ সহজ ছিল। মসজিদে ব্যবহৃত এই জাতের পাথর একমাত্র তাজমহলে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা যায়।

মসজিদের মিহরাব অংশে পাথর কেঁটে আকর্ষণীয় নকশা করা হয়েছে। পুরো মসজিদের চারপাশে তিন ফুট উচ্চতা পর্যন্ত যে কারুকার্য খচিত টাইলস লাগানো হয়েছে, সেগুলো ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল। 

প্রত্যেক প্রবেশদ্বারে পাথরখচিত খিলান মসজিদটিকে আরো বেশি দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। দোতলার ছাদে রেললাইনের স্লিপার ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদ ও গম্বুজের চারপাশে পাথর খোদাই করা পাতার ডিজাইন গ্রামীণ ঐতিহ্যের জানান দেয়।

মসজিদের ভূমিকম্প নিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে ভূমি খনন করে বেশ মজবুত পাতের ওপর স্থাপনাটির ভিত নির্মিত। ফলে বড় মাপের ভূমিকম্পও এখন পর্যন্ত মসজিদটিতে ফাটল ধরাতে পারেনি।

নির্মাণের পর থেকে এখনও বড় ধরনের কোনো সংস্কারের প্রয়োজন পড়েনি। শুধুমাত্র গম্বুজের এক জায়গায় আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে খানিকটা লিকেজ দেখা দিয়েছিল। তখন গম্বুজের ওপরের দিকের কিছু পাথর পরিবর্তন করতে হয়েছে। 

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দৃষ্টি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মহাসিং নদের পাশে দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহাসিক মসজিদটির প্রবেশপথ। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা মসজিদটি দেখতে আসেন। মসজিদের সামনে রয়েছে বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ। কাঠের তৈরি মসজিদের দরজা ও জানালা। 

মসজিদের সামনেই নির্মাণ করা হয়েছে হযরত আবু বকর (রাঃ) হাফিজিয়া মাদ্রাসা। মসজিদের পাশেই রয়েছে কবরস্থান। যেখানে শায়িত আছেন মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসিন মির্জা।

এলাকার সমাজকর্মী জামিউল ইসলাম তুরান জানান, মসজিদের উত্তর দিক দিয়ে বয়ে চলা মহাসিং নদীর শুনশান নীরবতা ও মসজিদের সৌন্দর্য্য মনোমুগ্ধকর। আমাদের ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটির সংস্কার কাজে প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

পাগলা উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের প্রভাষক ইয়াকুব শাহরিয়ার জানান, ঐতিহ্যবাহী পাগলা বড় জামে মসজিদটির আনুষঙ্গিক কাজগুলো মসজিদের নিজস্ব ফান্ড বা চাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়। সরকারের তরফ থেকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ পেলে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি পর্যটন শিল্পে একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারতো।

তিনি বলেন, অযত্ন আর অবহেলার ধারাবাহিকতায় দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বড় জামে মসজিদটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে।

দর্শনার্থী জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম বলেন, মসজিদে আমি আরেকবার এসেছিলাম। মসজিদে আসলে মনটা শীতল হয়ে যায়। আজ আমি আমার ছেলেকে নিয়ে এসেছি মসজিদটি দেখানোর জন্য।

শান্তিগগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা বলেন, মসজিদটি শান্তিগঞ্জ তথা সুনামগঞ্জের গৌরব। প্রাচীন এই মসজিদটিকে ঘিরে দর্শনার্থীরা এ এলাকায় আসেন। মসজিদ সংস্কার কাজে ইতিমধ্যে সামনের মাঠ ঢালাইয়ে উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করেছে। আমরাও চাই মসজিদটি সংস্কারের মাধ্যমে আরো সমৃদ্ব হোক।

সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় চড়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের পাশে পাগলা বড় জামে মসজিদ পৌঁছাতে পারবেন।