শিরোনাম

ঢাকা, ১০ মে ২০২৬ (বাসস) : ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের এক মাসের কাউন্টডাউন সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে। তবে এই উত্তেজনার সঙ্গে মিশে গেছে উদ্বেগও। আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম, বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরান যুদ্ধ ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের ওপর আগেভাগেই ছায়া ফেলেছে।
রেকর্ড ৪৮টি দল এবং লাখো ভক্ত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে ভিড় জমাতে যাচ্ছে। এই প্রথমবারের মত তিনটি দেশে যৌথভাবে আয়োজিত হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর।
প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী এই বিশাল আসর শুরু হবে ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে এবং শেষ হবে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ৮২,৫০০ আসনের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
তবে টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি পর্বের নানা অস্থিরতা এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যেন বিশ্বকাপ “হ্যাংওভারের” অনুভূতি দিচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যয়, রাজনীতি ও যুদ্ধের মিশ্র প্রভাব ইতোমধ্যেই উৎসবের আবহ নষ্ট করতে শুরু করেছে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য এসব উদ্বেগকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। তিনি নেতিবাচক সংবাদগুলোকে “নেগেটিভ প্রেস” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে বেভারলি হিলসের এক ব্যবসায়িক সম্মেলনে ইনফান্তিনো বলেন, ‘সত্যি বলতে কি, এই বিশ্বকাপ নিয়ে নেতিবাচক কিছু খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।’
কিন্তু ইনফান্তিনোর এই অতি আশাবাদী মনোভাব ফুটবল বিশ্বে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়নি।
বিশ্বকাপের টিকিটের লাগামছাড়া দাম বিশ্বজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যে কারনে ফিফা ও ইনফান্তিনো জনমতের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসই) বিশ্বকাপের মূল্য নির্ধারণকে “চরম শোষণমূলক” এবং “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, এই দাম সাধারণ ভক্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। যদিও টুর্নামেন্টটি থেকে ফিফা প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের আশা করছে।
২০২২ সালের ফাইনালের সবচেয়ে দামী টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১,৬০০ ডলার। অথচ ২০২৬ সালে ফিফা যে সর্বোচ্চ মূল্যের টিকিট বিক্রি করছে, অবিশ্বাস্যভাবে তার দাম দাঁড়িয়েছে ৩২,৯৭০ ডলার। যদিও ইনফান্তিনোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য এই মূল্য যথাযথ। তিনি বলেন, “আমাদের বাজারের বাস্তবতা দেখতে হবে। আমরা এমন এক বাজারে আছি যেখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বিনোদন শিল্প । তাই বাজারমূল্য অনুযায়ী টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।”
ফিফা জানিয়েছে, তারা ৫০ কোটির বেশি টিকিটের আবেদন পেয়েছে, যেখানে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ মিলিয়ে আবেদন ছিল ৫ কোটি।
টুর্নামেন্টের টিকিট ‘সোল্ড আউট’ দাবী করা হলেও, অনেক ম্যাচের টিকিট এখনও সেকেন্ডারি মার্কেটে পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১২ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে প্যারাগুয়ে বনাম যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচের টিকিটও।
এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও টিকিটের দাম দেখে বিস্মিত হয়েছেন। নিউ ইয়র্ক পোস্টকে তিনি বলেন, “আমি ওই সংখ্যাটা জানতাম না। আমি অবশ্যই সেখানে থাকতে চাইতাম, কিন্তু সত্যি বলতে আমিও এত টাকা দিতাম না।”
যেখানে একদিকে ভক্তরা টিকিটের দাম নিয়ে ভাবছেন, অন্যদিকে সমালোচকরা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কারণ ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৭৮টিই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত লাখো মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
যুদ্ধেও কারনে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো আয়োজক দেশ টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে অংশগ্রহণকারী আরেকটি দেশের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। ফিফা প্রধান ইনফান্তিনো অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান পরিকল্পনা অনুযায়ীই বিশ্বকাপে অংশ নেবে। যদিও ইরান চেয়েছিল তাদের ম্যাচগুলো মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়া হোক। সেই প্রস্তাব ইতোমধ্যেই বাতিল হয়ে গেছে। ফলে তাদের তিনটি গ্রুপ ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে।
৩০ এপ্রিল ভ্যাঙ্কুভারে ফিফা কংগ্রেসে ইনফান্তিনো বলেন, “অবশ্যই ইরান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেবে এবং অবশ্যই তারা যুক্তরাষ্ট্রেই খেলবে।”
ইনফান্তিনো আশা করছেন, মাঠের খেলা শুরু হলে এসব বিতর্ক মানুষ ভুলে যাবে এবং বিশ্বকাপ আবারও নাটকীয়তা ও অসাধারণ ফুটবলের উৎসবে পরিণত হবে।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসি অন্যতম ফেবারিট হিসেবে টুর্নামেন্টে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন, ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্স এবং ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বড় শিরোপার খোঁজে থাকা ইংল্যান্ড।
অন্যদিকে সম্প্রসারিত এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নেবে কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জনসংখ্যার হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ কুরাসাও এবং কেপ ভার্দে।