শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রামের কৃষিখাত। বিশেষ করে চট্টগ্রাম দক্ষিণের সাত উপজেলায় বন্যার পানির তোড়ে নষ্ট হয়ে যায় আমনের বীজতলা ও রোপণের জন্য প্রস্তুত করা চারা। এতে অনেক কৃষক সময় মতো আমন আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছিলেন।
তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর সরকারি সহায়তা, নতুন করে বীজতলা তৈরি এবং কৃষকদের দ্রুত উদ্যোগে পরিস্থিতি বদলে যায়। বন্যার সেই ধকল কাটিয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ জনপদের বিস্তীর্ণ জমিতে এখন আমনের চারা রোপণের ব্যস্ততা। দ্রুততার সাথে জমিতে চাষ দেওয়া, বীজতলা থেকে চারা নিয়ে রোপণ আর প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগে কৃষকের বাড়তি উৎসাহ— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক সবুজ বপনের উৎসব। ইতোমধ্যে জেলার বিস্তীর্ণ জমি সবুজ চারায় ভরে উঠছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম এর উপ-পরিচালক আপ্রু মারমা বাসসকে জানান, চলতি মৌসুমে জেলার ১৫টি উপজেলায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৭ আগস্ট পর্যন্ত আবাদ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমি। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবং ডোবা জমিগুলোতে পানি কমে আসায় আগামী দুই সপ্তাহে আবাদের গতি আরও বাড়বে। আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত আমন আবাদের সময় রয়েছে। এতে আগামীতে আরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে এবং এবার লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’
তিনি জানান, গত বছর জেলায় আমন আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৯ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর বন্যার কারণে শুরুতে আবাদ কিছুটা পিছিয়ে গেলেও বীজতলা তৈরিতে কৃষকদের সাড়া ছিল বেশি। এ বছর আমনের বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ২১১ হেক্টর। এর বিপরীতে বীজতলা তৈরি হয়েছে ১০ হাজার ৭৩১ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৫২০ হেক্টর বেশি জমিতে বীজতলা তৈরি হয়েছে। সে কারণে এবার আবাদের পরিমাণও বেশি হতে পারে।
আপ্রু মারমা জানান, বন্যার পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দ্রুতই কৃষকদের সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এতে আবাদের গতি এসেছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত বীজতলা তৈরি হওয়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত নতুন করে আমন আবাদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বন্যায় নষ্ট হয়ে যাওয়া চারা ও বীজের ঘাটতি পূরণে সরকারি সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সরেজমিনে জেলার পটিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী এবং সাতকানিয়া উপজেলায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখানকার কৃষি জমিগুলোতে আমনের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তারা কোথাও জমি প্রস্তুত করছেন, কোথাও বীজতলা থেকে চারা তুলছেন, কোথাও আবার দলবেঁধে চলছে চারা রোপণ। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলার দিয়ে, কোথাও সনাতন পদ্ধতি গরু দিয়েও জমিতে চাষ দেওয়া হচ্ছে, তারপর সেখানে নিঁড়ানি দিয়ে চারা রোপণের উপযোগী করা হয়। জমি প্রস্তুতের পর সেখানে প্রয়োজনমতো সার প্রয়োগ করছেন কৃষকরা। বড় গৃহস্থরা দিনমজুর-কৃষি শ্রমিকদের দিয়ে চারা রোপণ করাচ্ছেন।
পটিয়ার শান্তিরহাট ও কেলিশহর এলাকায় দেখা যায়, কৃষকরা আমন চারা রোপণের ব্যস্ততায় জমির আইলে বসেই দুপুরের খাবার সেরে নিচ্ছেন। কেলিশহরের কৃষক আবদুল জব্বার বাসসকে বলেন, ‘আমরা কৃষি পরিবার, বাপ-দাদার আমল থেকে ধানচাষ করে চলি। প্রতি বছর ৫ কানি (দুই একর) জমিতে ধানের চাষ করি। সাধারণত শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি থেকে চারা রোপণ করতে হয়। এবার বন্যার কারণে কিছুটা পিছিয়ে গেলেও এখন আবহাওয়া খুব ভালো। দ্রুত চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।’
চন্দনাইশের দোহাজারী এলাকার কৃষক শামসুল আলম বলেন, ‘বন্যার কারণে বীজতলা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে চারা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো জমিতে রোপণ করছি।’
উত্তর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার ‘গুমাইবিলে’ এখন আমন ধান রোপার উৎসব চলছে। সারা দেশের জন্য আড়াই দিনের খাদ্য উৎপাদনকারী হিসেবে পরিচিত বৃহৎ এই বিলে ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ আমন রোপা শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন, কৃষি কর্মকর্তারা।
গুমাইবিলের কৃষক আজিজার ভুঁইয়া বলেন, ‘গুমাইবিল বন্যার সময় কয়েকদিন পানির নিচে ছিল। সে কারণে অনেকের বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়। তবে সরকারি অফিস থেকে বীজ এবং চারা দেওয়াতে কৃষকরা দ্রুত জমিতে চাষ করতে পেরেছে। আমার ১০ কানি জমিতে আমন রোপা শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহে আবার সার দিতে হবে।’
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমন আবাদের এই ব্যস্ত সময়ে সার নিয়ে যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখছে কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন। কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা বলেন, চট্টগ্রামে চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে পর্যাপ্ত সারের মজুত রয়েছে। ফলে আমন মৌসুমে সার সংকটের আশঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, ‘সার নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সংকটের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজারে সারের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়েও নজরদারি রাখা হচ্ছে। সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট কিংবা অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া হবে না। কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে।’