শিরোনাম

আবু মোশাররফ
চট্টগ্রাম, ২৮ আগস্ট ২০২৬ (বাসস)-চট্টগ্রামের ফলের বাজারে এখন দেশি ফলের দাপট। পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙা, জাম্বুরা, বেল, কদবেল, আতা, পাইন্যাগুলা, লটকন, আনারস, পেঁপে ও তালের পাশাপাশি দেখা মিলছে মৌসুমী আখেরও।
নগরীর কাঁচাবাজার, অলিগলির ফলের দোকান কিংবা রাস্তার পাশের ভ্যানে— হাত বাড়ালেই মিলছে মৌসুমি এসব ফল। এর মধ্যেই আলাদা করে নজর কাড়ছে কয়েক বছর আগেও বাজারে তুলনামূলক কম দেখা যাওয়া পাইন্যাগুলা, লটকন, কদবেল, সফেদার মতো কিছু ফল। পার্বত্য জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে মিশ্র ফলের বাগান বাড়ায় এসব দেশি ফলের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তিন পার্বত্য জেলা থেকে দেশি ফল আসছে চট্টগ্রামের বাজারে। উত্তরাঞ্চল থেকে আসছে পাকা তাল, আখ আর কয়েক প্রজাতির ‘অসময়ের তরমুজ।’ এই সময়ে বাজারে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত সবুজ কমলা এবং স্থানীয়ভাবে ‘জ্বর-সর্দির মহৌষধ’ হিসেবে পরিচিত বিপন্ন প্রজাতির ‘কাটা জামির’ বা কাটা লেবু। চট্টগ্রামে ‘কাটা জাঁইর’ নামে পরিচিত দুষ্প্রাপ্য সাইট্রাস বা লেবু জাতীয় ফলটি এখন প্রায়ই বাজারে মিলছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ফলের দোকানগুলোতে মৌসুমি দেশি ফলের পসরা এখন বেশ সমৃদ্ধ। বড় বাজারের আড়ত থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ছোট দোকান, ফুটপাত ও ভ্যান— সবখানেই নানা ধরনের দেশি ফল সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। অনেক ক্রেতাই নির্দিষ্ট কোনো ফল কিনতে না এসে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পছন্দের ফল বেছে নিচ্ছেন। কেউ কিনছেন পেয়ারা, কেউ আমড়া-কামরাঙা, আবার কারও হাতে দেখা যাচ্ছে লটকন কিংবা পাইন্যাগুলার প্যাকেট।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের মৌসুমে দেশি ফলের বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে লটকন, তাল ও পাইন্যাগুলা আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে বাজারে আসছে। এসব ফল এক সময় বর্ষা মৌসুমে অল্প পরিমাণে পাওয়া গেলেও বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকত না। বিশেষ করে জাম্বুরা এবার গত দুই মাস ধরেই বাজারে সরবরাহ দেখা যাচ্ছে, এগুলো আরও দুই মাস মিলতে পারে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ফলের বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজারের ফলমন্ডির ‘বিসমিল্লাহ ট্রেডিং’ এর স্বত্বাধিকারী (আড়তদার) আবুল বশর জাতীয় বার্তা সংস্থা-বাসসকে বলেন, ‘বাজারে গত কয়েক বছর ধরেই দেশি ফলের সরবরাহ বেড়েছে। এর পেছনে বড় একটি কারণ পার্বত্য জেলাগুলোতে মিশ্র ফলের বাণিজ্যিক চাষ বৃদ্ধি।
পাহাড়ি এলাকায় একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের দেশি ফলের গাছ লাগানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এসব ফলের চারা সহজলভ্য হওয়া এবং বাজারে চাহিদা তৈরি হওয়ায় কৃষকরাও দেশি ফলের দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।
উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহও বাড়ছে। একই কারণে দেশ থেকে প্রায়ই হারিয়ে যেতে বসা পাইন্যাগুলা, আমলকির মতো অনেক দেশি ফল নতুন করে বাজারে ফিরছে।’
তিনি জানান, চট্টগ্রামের ফলমন্ডিতে প্রতিদিন রাতে ট্রাকে করে ঢুকছে জাম্বুরাসহ বিভিন্ন দেশি ফল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলা থেকে ফল নিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। আড়তে ফল নামানোর পর সেগুলো চলে যাচ্ছে খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে। এরপর ভ্যান, ফুটপাত ও পাড়া-মহল্লার দোকানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নগরের বিভিন্ন এলাকায়।
চট্টগ্রামের ফলের বাজারে প্রতি বছর এই সময়ের ‘নায়ক’ হয়ে উঠে জেলার চন্দনাইশ-পটিয়া অঞ্চলে উৎপাদিত ‘কাঞ্চন’ পেয়ারা। আকার ও স্বাদের কারণে স্থানীয় ক্রেতাদের মধ্যে এ পেয়ারার চাহিদা রয়েছে। কাঞ্চন পেয়ারা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এখন শহরের সর্বত্রই এই পেয়ারার বেচাকেনা চলছে হরদম। ফলটি সাধারণত ডজন হিসেবে বিক্রি হয়। আকারভেদে প্রতি ডজন কাঞ্চন পেয়ারার দাম ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।
নগরীর বহদ্দারহাটের একটি ফলের দোকানদার বলেন, ‘কাঞ্চননগরের পেয়ারা বাজারে আসলেই ভালো বিক্রি হয়। এখানকার মানুষজন এই পেয়ারা চেনেন। দেশি ফল হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। অনেকে এখন বিদেশি ফলের চেয়ে স্থানীয় পেয়ারা কিনতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।’
মৌসুমি ফলের তালিকায় পাইন্যাগুলা-লটকন নতুন নয় কিন্তু এক সময় চট্টগ্রামের বাজারে এগুলো এতটা সহজলভ্য ছিল না। সপ্তাহখানেক বা মাসখানেক উঠতো, তারপর বাজার থেকে উধাও হয়ে যেতো। কিন্তু এবার চট্টগ্রামের বাজারে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে দেখা যাচ্ছে। দেশীয় এই ফলগুলো ঔষধিগুণ সম্পন্ন বলে চিকিৎসকরা প্রায়ই মানুষজনকে এসব খেতে উৎসাহিত করেন। সে কারণে মৌসুম এলে মানুষজন এসব কেনার দিকে ঝোঁকেন। বাজারে এখন লটকন ও পাইন্যাগোলা কেজি প্রতি ১৫০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা নুরুস ছফা বাসসকে বলেন, ‘ছোটবেলায় যেসব ফল নিয়মিত খাওয়া হতো, সেগুলোর অনেকগুলো প্রায়ই হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে গত কয়েক বছর ধরে বাজারে আবার আমলকী, লটকন, পাইন্যাগুলা, তালসহ নানা দেশি ফল বাজারে বেশি দেখা যাচ্ছে। পরিবারের ছোটদের এসব ফলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগও হচ্ছে এখন।’
তিনি বলেন, বাজারে নানা ধরনের বিদেশি ফল থাকলেও মৌসুমি দেশি ফলের স্বাদ আলাদা। দাম নাগালের মধ্যে থাকলে তিনি দেশি ফলই বেশি কেনেন।
পেয়ারা, লটকন ও পাইন্যাগুলার পাশাপাশি বাজারে আমড়া ও কামরাঙ্গারও ভালো চাহিদা রয়েছে। বাজারে প্রতি ডজন আমড়া ও কামরাঙা ১২০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এসব ফল লবণ-মরিচ দিয়ে ভিন্নস্বাদ নিয়ে খান। কেউ আবার কাঁচা ফল আচার বা ভর্তা তৈরির জন্যও নিয়ে যাচ্ছেন।
নগরীর মোমিন রোডে একটি ভ্যানের ফল বিক্রেতা বলেন, ‘বিকেলের পর আমড়া ও কামরাঙ্গার বিক্রি বাড়ে।
বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে কাঁচা আমড়া-কামরাঙ্গার চাহিদা রয়েছে। ভ্যানে করে এসব ফল বিক্রি করলে দ্রুত শেষ হয়ে যায়।’
মৌসুমি ফলের বাজারে আনারসও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। আকার ও মানভেদে এক জোড়া আনারস ৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে তাল। পাকা তালের রস দিয়ে নানা ধরনের পিঠা তৈরি করা হয়। শৌখিন নারীরা তালের পিঠা বানানোকে শখ হিসেবেও দেখেন। মৌসুমের এই ফলটি নিয়েও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। চট্টগ্রামের বাজারে এখন আকার ভেদে প্রতিটি তাল ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
এ সময় বাজারে আরেকটি পরিচিত দৃশ্য আখের স্তূপ। প্রতিটি আখ ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
নগরের বিভিন্ন সড়কের পাশে ভ্যান ও ছোট দোকানে আখ নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। অনেকে বাড়িতে যাওয়ার সময় একসঙ্গে কয়েকটি আখ কিনছেন। রাস্তার পাশে ভ্যানে ফল পাওয়া যাওয়ায় বাজারে ঢোকার ঝামেলা ছাড়া অফিস বা কাজ শেষে ফেরার সময় অনেকেই প্রয়োজনমতো ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
অসময়ের তরমুজও বাজারে :
মৌসুমি দেশি ফলের ভিড়ের মধ্যেও বাজারে দেখা যাচ্ছে কয়েক ধরনের তরমুজ। সাধারণ মৌসুমের বাইরে পাওয়া এসব তরমুজের দাম অবশ্য বেশ চড়া। বিক্রেতারা কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা দাম হাঁকছেন। ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভিন্ন মৌসুমে পাওয়া ফলের প্রতি ক্রেতাদের আলাদা আগ্রহ থাকে। তবে দামের কারণে অনেকেই তরমুজ কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
চট্টগ্রামের প্রথম ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, চট্টগ্রাম-এর কনসালট্যান্ট (ডায়েট ও নিউট্রিশন) হাসিনা আকতার লিপি বাসসকে বলেন, ‘বিদেশি ফলের তুলনায় আমাদের দেশি ফলগুলোর পুষ্টিগুণ অনেকগুণ বেশি। দুটি উদাহরণ দিচ্ছি— একটি আমলকী খেলে যে পরিমাণ পুষ্টি পাওয়া যায়, ৫০টি কমলা খেলেও সে পরিমাণ পাওয়া যায় না, একটি পেয়ারায় যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে ২০টি আপেলেও তা নেই। এখন চট্টগ্রামের বাজারে যেভাবে দেশি ফলের বৈচিত্র্য এবং সহজলভ্যতা দেখা যাচ্ছে গত কয়েক বছর আগেও এভাবে দেখা যায়নি। এটা নিশ্চয়ই খুব ভালো একটি দিক। মানুষের মধ্যে দেশি ফল সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে, অভিভাবকরা সন্তানদের আগের তুলনায় দেশি ফল বেশি খাওয়াচ্ছেন। তবে একজন পুষ্টিবিদ হিসেবে বলবো— জুসের পরিবর্তে আস্ত তাজা ফলটি খেতে হবে, তাহলেই উপকার বেশি মিলবে।’
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এস এম নাজের হোসাইন বাসসকে বলেন, ‘দেশি ফলের বর্তমান বৈচিত্র্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত বাজার থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা কিছু ফলের আবার ফিরে আসা। লটকন, পাইন্যাগোলা কিংবা কদবেলের মতো ফল শুধু স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং স্থানীয় খাদ্য সংস্কৃতিরও অংশ। এক সময় গ্রামের বাড়ির উঠান, পুকুরপাড় কিংবা বসতভিটার আশপাশে যেসব ফলের গাছ দেখা যেত, সেসব গাছ ধীরে ধীরে কমে যাওয়ায় অনেক ফলও বাজার থেকে কমে গিয়েছিল। এখন কৃষিতে বৈচিত্র্য আসার কারণে, মিশ্রফলের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ায় সেই চিত্রে পরিবর্তন আসছে। ফলে শুধু উৎপাদন নয়, বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে ফল উৎপাদনে যেন ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রয়োগ নিয়ন্ত্রিত থাকে তা সরকারকে মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, দেশি ফলের প্রতি মানুষের আগ্রহ ধরে রাখতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্য দামও নিশ্চিত করা দরকার। এতে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি বাজারে দেশি ফলের বৈচিত্র্যও বাড়বে।’