শিরোনাম

॥ ভুবন রায় নিখিল ॥
নীলফামারী, ১০ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): এক সময় গ্রাম-গঞ্জ ও শহরের প্রতিটি বাড়িতে বাঁশের তৈরি ডালা, চালুনি-কুলাসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। এখন আর আগের মতো ওইসব পণ্যের কদর নেই বললেই চলে। প্রযুক্তির কল্যাণে এর বাজার দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকের পণ্য।
ওইসব পণ্যের কদর না থাকলেও বাঁশের সিলিংয়ের ব্যবহার এবং গুরুত্ব রয়েছে সর্বত্র। বাঁশের তৈরি পণ্যে কদর কমতে থাকায় কষ্টে জীবন চলতো নীলফামারীর হাজীমুল ইসলামের।
ইতোমধ্যে তিনি বাঁশের তৈরি সিলিংসহ বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক পণ্য তৈরি করে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে ফেলেছেন। বলা যেতে পারে এখন তিনি বাঁশজাত হস্তশিল্পের একজন সফল উদ্যোক্তা।
হাজীমুলের কারখানায় তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক বাঁশের পণ্য। পরিবেশবান্ধব এসব পণ্য এখন স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরেও। তার এ উদ্যোগে শুধু নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় অন্তত ২০ নারী-পুরুষের।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার উত্তর সোনাখুলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের হাজীমুল ইসলামের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটিও বেশ সংগ্রামের। বাঁশের সিলিং (টিনসেড ঘরের রুমের সিংলিং) তৈরির মিস্ত্রি থেকে তার এ সংগ্রামের পথ শুরু। উপায় খুঁজতে থাকেন বাঁশের কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর। সেই স্বপ্নে স্থাপন করেন ছোট পরিসরে বাঁশের পণ্য তৈরির কারখানা।
এরপর কারখানায় তৈরি পণ্যের বাজার ও কাঁচামাল সংগ্রহে পড়তে হয়েছে নানা বিরম্বনায়। কিন্তু থেমে যায়নি স্বপ্ন, ধীরে ধীরে বিভিন্ন মাধ্যমে পণ্যের প্রচার, স্থানীয় ক্রেতাদের আস্থায় বাড়তে থাকে তার ব্যবসার প্রসার। এতে করে টিকে থাকে তার স্বপ্ন। এখন নজরকাড়া ডিজাইনে বিভিন্ন বায়ারের মাধ্যমে এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে দেশের বাইরে।
সরেজমিনে সৈয়দপুর উপজেলার উত্তর সোনাখুলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে তার নিজ বাড়িতে গড়ে তোলা কারখানায় গিয়ে দেখা মেলে বাঁশের তৈরি করা নজরকাড়া পণ্য। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। কর্মচারীরা যেমন ব্যস্ত বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজে। তেমনি হাজীমুল ব্যস্ত পণ্যের নকশা ফুটিয়ে তুলতে। সকলের দক্ষ হাতের নিপুণ কারুকাজে সাধারণ বাঁশ হয়ে উঠছে দৃষ্টিনন্দন সামগ্রী হিসেবে।
হাজীমুল ইসলাম বাসসকে বলেন, তার ওই কারখানায় বাঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ১২০ প্রকার পণ্য। এসবের মধ্যে ঝুড়ি, ট্রে, টেবিল ল্যাম্প স্ট্যান্ড, সাবানদানি, কলমদানি, ফুলদানি, টিস্যুবক্স, সোফা সেট, একতারা ও ম্যাগাজিন ফাইল হোল্ডারসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন উপকরণ উল্লেখযোগ্য। তৈরি পণ্যের একটি অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও বিভিন্ন বায়ারের মাধ্যমে যাচ্ছে বিদেশে।
হাজীমুল ইসলামের কারখানায় বর্তমানে স্থানীয় নারী ও পুরুষ মিলে প্রায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের শ্রম, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় তৈরি হচ্ছে এসব পণ্য। শ্রমিকের মজুরি, বাঁশ, বেত ও কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য ক্রয় খরচ বাদে বিক্রি ও রপ্তানি থেকে মাসে গড় আয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বলে জানান তিনি। এ আয় দিয়ে বর্তমানে স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে তার সংসারসহ ৩ সন্তানের লেখাপড়া।

কাঁচামাল হিসেবে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া থেকে ‘ভুতুম’ জাতের বাঁশ (লম্বা ও মোটা আকৃতির) সংগ্রহ করেন। প্রতিটি বাঁশে পরিবহনসহ গড়ে খরচ হয় ৭শ’ টাকা। এসব বাঁশ প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় বিভিন্ন পণ্য।
তিনি কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানান। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মূলধন ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হাজীমুল ইসলাম চায় তার এ উদ্যোগকে আধুনিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করতে। এজন্য কারখানায় সংযোজন করতে চান আধুনিক যন্ত্রপাতি। নিত্য নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরি করে কারখানায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান আরো অধিক মানুষের। কিন্তু এসবের বড় বাধা পুঁজির যোগান।
তিনি বলেন, ‘সহজ শর্তে ঋণ পেলে আমার এ ছোট উদ্যোগকে অনেক বড় করা সম্ভব হবে। দেশের যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একাজে সম্পৃক্ত করা হলে কমবে বেকারত্ব, বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এজন্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাঁশের পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া হলে দেশের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হবে’।
নীলফামারী বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক মো.নূরেল হক বাসসকে বলেন, ‘হাজীমুলের বাঁশদিয়ে তৈরি ১২০ প্রকার পণ্য এখন শুধু একটি কুটির শিল্প উৎপাদন কেন্দ্র নয়, এটি এক জীবন্ত স্বপ্নের নাম। বাঁশের প্রতিটি বুননে লেখা হচ্ছে তার আত্মনির্ভরতার গল্প। জানিয়ে দিচ্ছে গ্রামীণ বাংলার বাঁশজাত শিল্পের সম্ভাবনার কথা। এখানে শুধু পণ্য তৈরি হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের পরিধি পেরিয়ে যাচ্ছে দেশের সীমানা’।
বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাঁশ, বেত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে নীলফামারীর মতো অঞ্চলে বাঁশভিত্তিক কুটির শিল্পের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা’।
হাজীমুল ইসলামের উদ্যোগকে সফল করতে বিসিকের পক্ষ থেকে বিনা সুদে এক লাখ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে এগিয়ে নিতে বিসিক সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে বলেও জনান তিনি।