শিরোনাম

মো. মামুন ইসলাম
রংপুর, ৪ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : বিলুপ্ত খাল, বিল ও পুকুর সফলভাবে পুনঃখনন এবং তীরে বৃক্ষরোপণের ফলে হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের উন্নতি ঘটায় রংপুর অঞ্চলে এক মনোমুগ্ধকর সবুজায়ন সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারের ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদী (২০১৯-২০২৫) ‘ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ (ইআইআর)’ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এটি সম্ভব হয়েছে।
কৃষি, মৎস্য চাষ, বৃক্ষরোপণ, গবাদি পশুর খাদ্যের জন্য ঘাস এবং শাকসবজি ও কলা চাষ, হাঁস পালন এবং মাছ ধরার মাধ্যমে জীবিকার উন্নতি ঘটিয়ে এই প্রকল্প থেকে হাজার হাজার গ্রামীণ মানুষ বহুমুখী সুবিধা পাচ্ছেন।
পুনঃখনন করা খাল, বিল ও পুকুরের জলাশয়গুলো ও পাড়ের বনায়ন এখন বিভিন্ন দেশীয় পাখির কলতান, উদ্ভিদ ও প্রাণী, পোকামাকড় এবং তীরে বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছে পরিপূর্ণ, যা এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার ৩৫টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইআইআর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং রংপুর সার্কেলের বিএমডিএ-র সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, সদ্য বাস্তবায়িত এই প্রকল্প থেকে হাজার হাজার মানুষ ব্যাপক ও বহুমুখী সুবিধা ভোগ করছেন।
সংরক্ষিত ভূপৃষ্ঠের জলের সর্বোত্তম ব্যবহার করে কৃষির প্রসার, বনায়ন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্েযর উন্নয়ন, বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ, পোকামাকড়, পাখি, উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য অভয়ারণ্য তৈরির লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের অধীনে বিলুপ্ত খাল, বিল ও পুকুর পুনঃখনন, স্বল্প উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প স্থাপন, সৌরশক্তিচালিত খননকৃত কূপ, ফুটওভার ব্রিজ ও ক্রস ড্যাম নির্মাণ এবং ২ লাখ ৩০ হাজার কাঠ, ফল ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে ফসলি জমিতে সেচের জন্য নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহার, খননকৃত কূপের পানি ব্যবহার করে কম সেচ প্রয়োজন এমন ফসলের চাষ বৃদ্ধি এবং বনজ সম্পদ বৃদ্ধির সুবিধাও তৈরি করা হয়েছে।’
বাসসের সঙ্গে আলাপকালে প্রকল্পটির স্থানীয় সুবিধাভোগী গ্রামবাসীরা আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, চার দশক পর তারা বিলুপ্ত জলাশয়গুলোর চারপাশের হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন, সতেজ পরিবেশ এবং অত্যাশ্চর্য সবুজায়ন ও জীববৈচিত্র্য পুনরায় দেখতে পাচ্ছেন।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার সংকরপুর গ্রামের মশিউর রহমান বলেন, বিলুপ্তপ্রায় মরা তিস্তা নদী পুনঃখনন এবং তীরের বৃক্ষরোপণের ফলে নদীকেন্দ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে।
কামারপাড়া গ্রামের গৃহিণী আজমিরা খাতুন ও মোমিনা বেগম এবং ঝারপাড়া গ্রামের ফাহমিদা বলেন, মরা তিস্তা নদী পুনঃখননের পর তারা হাঁস পালন এবং কলা ও সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
একই উপজেলার কাজিপাড়া গ্রামের কৃষক গোলাম মুর্তুজা বলেন, বিলুপ্তপ্রায় ঘিরনই নদী পুনঃখনন এবং এর তীরে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণের ফলে বিশাল পরিমাণ ফসলি জমি জলাবদ্ধতামুক্ত হয়েছে এবং প্রকৃতি সবুজ হয়ে উঠেছে।
নিকটবর্তী কুঠিপাড়া গ্রামের আবদুর রহমান, মোহাম্মদ হামিদ ও মাহবুবার রহমান জানান, তারা পুষ্টি জোগাতে এবং জালে ধরা দেশি মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের জন্য পুনঃখনন করা ঘিরনই নদীতে মাছ ধরছেন।
এদিকে, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ১১.৫৯ একরের ভাড়ারদহ বিল পুনঃখনন এবং এর ১০০ ফুট প্রশস্ত তীরে ২১৩ প্রজাতির দুর্লভ কাঠ, ফল, ঔষধি ও ফুলের গাছ লাগানোর ফলে এক নয়নাভিরাম সবুজ ভূদৃশ্য তৈরি হয়েছে।
ভাড়ারদহ বিলের তীরে প্রায় ৭ হাজার গাছ সবুজায়নসহ অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর একটি বিলাসবহুল বাগান তৈরি করেছে, যা এটিকে পরিযায়ী ও বিপন্ন দেশীয় পাখি, মাছ, প্রাণী, পোকামাকড়, উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জন্য একটি অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে।
নিকটবর্তী গ্রাম ডাঙ্গাপাড়ার হাফিজুর রহমান বলেন, সমৃদ্ধ উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে পরিপূর্ণ ভাড়ারদহ বিলটি পুনরুজ্জীবিত বাস্তুতন্ত্রে মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষ সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মোতালেব বলেন, বোয়ালেরদারা খাল পুনঃখনন এবং এর তীরে চারাগাছ রোপণের ফলে কৃষির উন্নতি হয়েছে, বাস্তুতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং পরিবেশের উন্নতি ঘটেছে।
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার বেতগাড়া গ্রামের গৃহবধূ নূর সালমা বলেন, ১০.৯৪ একরের ষষ্ঠিছড়া বিল পুনঃখনন এবং এর তীরে চারাগাছ রোপণের ফলে চারপাশের সবুজের মাঝে বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন এসেছে, যা শত শত মানুষকে উপকৃত করছে।