বাসস
  ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৬:৪২
আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৭:১৫

সুন্দরবনে অবাধ বিচরণ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের

ছবি : সংগৃহীত

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান

খুলনা, ২৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : আজ বুধবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। এক সময় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রাণীটি ছিল চরম হুমকির মুখে। তবে কার্যকর আইন ও জনসচেতনতায় সুন্দরবনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা এখন বন-বাদাড়ে, এমনকি বন বিভাগের অফিস এলাকাতেও অবাধে ঘোরাফেরা করছে বাঘ । বন এলাকায় তারা স্বাধীনভাবেই চলাফেরা করছে। 

এ বিষয়টিকে বন বিভাগ মনে করছে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। সরকারও সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সুন্দরবনে ২০১৫-২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে ১৯টি বাঘ বেড়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

তবে, চোরা হরিণ শিকারি, খাদ্য সংকট ও পরিবেশ দূষণসহ অন্যান্য ঝুঁকি তাদের জন্য অনেকটা বৈরী আবহাওয়া তৈরি করছে। এ অবস্থার মধ্য দিয়েই আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস।

দিবসটি উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং এটি পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এদিকে, বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনে দুই দফা বাঘের দেখা মিলেছে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিস চত্বর এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘকে।

বন বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জুলাই সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আন্ধারমানিক বন অফিসের সামনে একটি বাঘিনী কিছুক্ষণ খোলা জায়গায় কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। এরপর ২৬ জুলাই সকালে কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকায় টহলরত বন বিভাগের একটি বোটের সামনে একটি বাঘকে নদী সাঁতরে পার হতে দেখা যায়। বোটের শব্দ শুনে বাঘটি বনে ফিরে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান সেই বিরল দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, সুন্দরবনের নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, নিজের এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে। তবে এতো কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে বাঘ-মানুষের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের চলাচলও আগের তুলনায় বেড়েছে। 

তিনি বলেন, আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। ফলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে অবাধে বিচরণ করছে এবং বন অপরাধও কমেছে।

মূলত : কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বর্তমানে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবুও চোরা শিকার, পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো নানা হুমকি এখনো সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় উদ্বেগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে, যখন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে।

সূত্র আরও জানায়, গত আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে। এছাড়া উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বাঘের চামড়ার সূত্র ধরে আরও কয়েকটি বাঘ পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত নেই। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।

তবে, বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের ব্যবহার, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফল হিসেবে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা দেন। পরে গত ১২ জুলাই সুস্থ হওয়া বাঘিনীকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে বনাঞ্চলের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বন বিভাগ এ ঘটনাকে বাঘ সংরক্ষণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছে।

এদিকে, সুন্দরবনে ২০১৫-২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে ১৯টি বাঘ বেড়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। এর আগে ২০১৫ সালে ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪টি এবং ২০২৪ সালের জরিপে ১২৫টি বাঘের তথ্য মিলেছে। এতে করে ২০১৫-২০২৪ সাল ৯ বছরে বাঘ বেড়েছে ১৯টি। সাতক্ষীরা, খুলনা এবং চাঁদপাই-শরণখোলা রেঞ্জে বিভিন্ন সময় বন বিভাগ জরিপ চালিয়ে এই তথ্য পেয়েছিল। ২০১৫ সালে এসব রেঞ্জে ১ হাজার ২১৫ বর্গকিলোমিটার, ২০১৮ সালে ১ হাজার ৬৫৬ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২৪ সালে ২ হাজার ২৪০ বর্গকিলোমিটারে এই জরিপ করা হয়।

সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘ আগের তুলনায় মানুষের নজরে বেশি আসছে। তাছাড়া বনে বর্তমানে বাঘের খাবারের সংকট নেই। বাঘের প্রধান খাবার চিত্রা হরিণ এবং বন্য শুকরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি কটকা, কচিখালী এবং শরণখোলা রেঞ্জে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। গেল এক বছরে সুন্দরবনে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরা লাইভ বাঘ দেখতে পেয়েছেন। এমনকি বন বিভাগের বিভিন্ন অফিসেও বাঘের বিচরণ বেড়েছে।

বন বিভাগের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে চিত্রা হরিণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি এবং বন্য শূকর ৪৭ হাজার ৫১৫টি। বাঘের খাবারের ৭৮ ভাগ চিত্রা হরিণ, ১১ ভাগ বন্য শূকর এবং ১১ ভাগ অন্য স্থান থেকে আসে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও নির্মল কুমার রায় বাসস'কে বলেন, ইদানিং পর্যটকরা বাঘ দেখতে পাচ্ছেন। এছাড়া আমাদের বিভিন্ন অফিসের ক্যামেরাতে ভিন্ন ভিন্ন বাঘের ছবি মিলছে। এটা খুবই ভালো লক্ষণ। তাছাড়া বনে এখন বাঘের পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। বাঘ নিজেকে নিরাপদ মনে করার কারণে তার বিচরণ বাড়িয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, বাঘ শিকারি নেই বললেই চলে। হরিণ শিকারির ফাঁদে অনেক সময় বাঘ আটকা পড়ে। তবে এ বিষয়ে আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বাসস’কে বলেন, বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের চারটি রেঞ্জে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বিশেষ করে বাঘ রক্ষায় আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে সুন্দরবন এলাকার মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।