বাসস
  ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৭:৫০

দিনাজপুরে বাঁশ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিসিক কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি

ছবি: বাসস

॥ রোস্তম আলী মন্ডল ॥ 

দিনাজপুর, ২৬ জুলাই ২০২৬ (বাসস): জেলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। অল্প কিছু পরিবার তাদের পূর্ব-পুরুষদের পেশা বাঁচিয়ে রাখতে এখনও বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন জিনিস প্রস্তুত করে বাজারে বিক্রি করছেন।

বাঁশ শিল্প কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব, কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে এই শিল্প এখন হুমকির মুখে। তাই দেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। এজন্য তারা বাঁশ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি ও হস্তক্ষেপ কামনা করেন। 

জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখনও পর্যন্ত কিছু কারিগর এই পেশা ধরে রেখেছেন। তবে বাঁশজাত দ্রব্যের চাহিদা কমে যাওয়া, কাঁচামাল হিসাবে বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়া এবং শ্রমের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে এক সময় বাঁশের তৈরি শিল্প পণ্যের ব্যবসা ছিল রমরমা। প্রতিটি পরিবারে কুলা, ডালি, ঝুড়ি, মোড়া, খেলনা, মাছ ধরার ডার্কি, খলইসহ নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হতো। গ্রামীণ হাটবাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও, প্লাস্টিকের সস্তা ও টেকসই বিকল্পের কারণে বাঁশের তৈরি পণ্যের বাজার এখন সংকুচিত হয়ে গেছে।

সাপ্তাহিক বা দৈনিক বাজারে বাঁশ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকমের জিনিসপত্র বেচাকেনা করতে দেখা গেলেও, দিন দিন এসব সামগ্রীর বিক্রি কমছে বলে জানান ক্রেতা ও বিক্রেতারা।

জেলার বোচাগঞ্জ হাটে বাঁশের তৈরি পণ্যের কারিগরেরা জানান, বাঁশের পণ্য তৈরিতে সময় ও শ্রমের তুলনায় তারা এখন ন্যায্য মূল্য পান না। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায়, উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। একসময় স্থানীয় বাঁশ সহজে পাওয়া যেত, এখন বন উজাড় ও অপরিকল্পিত বৃক্ষ-রোপণের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে বেশি দামে বাঁশ কিনতে হয়।

চল্লিশ বছর ধরে বাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত অভিজ্ঞ কারিগর সুবাশ পাল বাসসের সাথে আলাপকালে বলেন, আগে বাঁশের কাজ করে সংসার ভালো চলত, এখন আর ভালো চলে না। ছেলে-মেয়েরা শিখতে চায় না। সবাই অন্য কাজ খুঁজছে। অনেক কারিগর এখন দিনমজুর বা ইজিবাইক চালাচ্ছে।

কারিগর অধীরচন্দ্র রায় বলেন, বাঁশের দাম এখন অনেক বেশি। তৈরি করা পণ্যের বেচাকেনাও কমে গেছে। লাভ কম-বেশি যাই হোক, বাধ্য হয়ে পূর্ব-পুরুষদের এই পেশা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা ছোট থেকে এই বাঁশের জিনিস তৈরির কাজ শিখেছি। বাপ-দাদাদের কাজ করা দেখেই এই কাজ এখন পর্যন্ত করে যাচ্ছি। কুলা, ডালি, হাঁস ঢাকা চালা, পাখা ইত্যাদি বানাই। ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। 

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘হয়ত এক সময় আধুনিকতার ছোঁয়ায় এটা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্য পেশায় চলে যাবে। তখন হয়ত এই পেশায় আর কোনো কারিগর পাওয়া যাবে না!’

কারিগর কান্তিলাল রায় বলেন, ‘আমার বাপ-দাদারা এ ব্যবসা করেছেন, এখন আমিও করছি। দাম বেশি, হাজিরা মূল্যও বেশি। আমরা সপরিবারে বাঁশ শিল্পের কাজ করি। সংসার চালাতে কষ্ট হয়। শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এ কাজ করে যাচ্ছি।’

কারিগর সুরেশ বর্মন বলেন, আমার তিন সন্তান। বড় ছেলেকে অন্য পেশায় দিয়েছি। কারণ এই ব্যবসা দিয়ে সংসার চলে না। ছোট ছেলে বাঁশ শিল্পের কাজে আমার সাথে থাকে। মেয়ে লেখাপড়া করছে। আমি সেতাবগঞ্জ, কাহারোল, ধুকুরঝাড়ি, দিনাজপুর, মঙ্গলপুর হাটে তৈরি করা বাঁশের পণ্য নিয়ে ব্যবসা করি। 

কারিগর জামাল উদ্দিন কুলা, ঢাকি, পাখা, চালনসহ বিভিন্ন বাঁশের পণ্য বানিয়ে বিক্রি করেন। তিনি জানান, ডালির দাম সাইজ অনুযায়ী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, অন্য সব বাঁশের তৈরি পণ্য একই দামে বিক্রি করতে হয়। 

তিনি বলেন, ‘আধুনিকতার ছোঁয়ায় তৈরি বাঁশের পণ্য রং-চং করে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে, ভালো দামে বিক্রি করা যায়। এ জন্য আমি বাঁশের পণ্য ওই আঙ্গিকে তৈরি করে বাজারজাত করতে শুরু করেছি। এতে আমার ভালো লাভ হচ্ছে।’

তরুণ উদ্যোক্তা সোহাগ হোসেন বলেন, বাঁশ শিল্প শুধু অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। শিল্পটি বিলুপ্ত হলে আমরা ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবো। এটি রক্ষা করতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ, আধুনিক ও মান-সম্পন্ন বাঁশ শিল্পের প্রসার ও বাজারজাতকরণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তবেই শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।   

কারিগরদের মতে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরিতে বিসিক কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানসম্মত পণ্য তৈরি ও বাজারজাত নিশ্চিত করা হলে কারিগররাও উৎসাহিত হবে। এছাড়াও, এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল বাঁশের বাণিজ্যিক উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহ প্রদান এবং সহজ ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বাঙালির ঐতিহ্য বাঁশ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

তারা বলেন, এই শিল্পের কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় দিনাজপুরে বাঁশ শিল্পের ইতিহাস বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বিসিক দিনাজপুরের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। বাঁশের কারিগরদের কমপক্ষে তিন মাস মেয়াদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ঋণ নিতে ইচ্ছুক কারিগরদের জন্যও ব্যবস্থা আছে। শিল্পটির তদারকি ও সহায়তা বৃদ্ধি করা হবে। যা মানসম্মত এবং টেকসই পদ্ধতির বাঁশের পণ্য তৈরি ও বাজারজাতকরণে সহায়ক হবে।