বাসস
  ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৭:৪১

মাদারীপুরে একটি সড়কের অভাবে তিন গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগে 

ছবি: বাসস

॥ বেলাল রিজভী ॥

মাদারীপুর, ২৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছরই জেলার কুলপদ্দি বাজার থেকে বাহের মাদ্রা, আজিতুল্লাপাড়া ও ব্রাহ্মন্দী গ্রামের একমাত্র প্রধান সংযোগ সড়কটির অধিকাংশ জায়গাতেই হাঁটুসমান কাদা এবং বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। আর এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তিন গ্রামের হাজার হাজার মানুষের।

দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ৫৫ বছর অতিক্রম হলেও মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের এ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ কাঁচা সড়কটি বাহের মাদ্রা, ব্রাহ্মন্দী ও আজিতুল্লাপাড়া এ তিন গ্রামের হাজার হাজার মানুষের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র প্রধান পথ। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো সড়কটি কাদার সাগরে পরিণত হয়, যা স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, কৃষক ও মুমূর্ষু রোগীদের জন্য এক চরম অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুলপদ্দি বাজার থেকে দক্ষিণে সন্নামত বাড়ি হয়ে বাহের মাদ্রা, আজিতুল্লাপাড়া ও ব্রাহ্মন্দী গ্রামের এ সংযোগ সড়কটির অধিকাংশ জায়গাতেই হাঁটুসমান কাদা। অনেক স্থানে বৃষ্টির পানি জমে রীতিমতো ছোট ছোট জলাশয় ও ড্রেনের মতো বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন সকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছেন তিন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষসহ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। একটু বৃষ্টি হলেই কোনো ধরনের যানবাহনের প্রবেশাধিকার থাকে না বললেই চলে।

এলাকাবাসীর তথ্য অনুযায়ী, ‘মাদ্রা মিঠু হাওলাদারের বাড়ি থেকে নয়া পুকুরপাড় পর্যন্ত’ অংশটি কাগজে-কলমে একাধিকবার সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো প্রকল্প থেকেই আজ পর্যন্ত কোনো মাটি কাটা বা পাকা করার কাজ শুরু হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালি আর বর্ষাকালে পিচ্ছিল কাদার কারণে যেকোনো মুহূর্তে এখানে বড় ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সড়কের এমন করুণ দশার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন এলাকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কাদা এবং গর্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। অনেক সময় জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে বৃষ্টি নামলে শিক্ষার্থীরা আর ক্লাসে যেতে পারে না। যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্থানীয় শিক্ষার হারের ওপর।

অন্যদিকে, উর্বর এই অঞ্চলের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষি পণ্য সঠিক সময়ে হাটে-বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে না পারায় অকে সময়ে লোকসান গুণতে হয়। কাঁচা রাস্তায় কোনো যানবাহন চলাচল করতে না পারায় কৃষকদের কুলি দিয়ে বা নিজেদের কাঁধে করে অথবা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে পণ্য বাজারে পৌঁছাতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা এবং অতিরিক্ত যাতায়াত খরচের কারণে কৃষি ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয় কোনো গর্ভবতী নারী, বয়োবৃদ্ধ বা জরুরি মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে। রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স কিংবা থ্রি-হুইলার প্রবেশ করতে না পারায় চাদরে বেঁধে বা খাটিয়ায় করে রোগীকে প্রধান সড়কে নিতে হয়। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।

হতাশা প্রকাশ করে স্থানীয় জ্যেষ্ঠ বাসিন্দা আলিম মাতুব্বর বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পার হয়ে গেলেও এ রাস্তাটা যেন আমাদের জন্য এক মরণফাঁদ হয়ে রয়েছে। চারপাশের সব জায়গায় কত উন্নয়ন হলো, কিন্তু আমাদের এ রাস্তার এত বছরেও কোনো উন্নয়ন হলো না। একটু বৃষ্টি হলেই পুরো গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না, আমরা বয়স্করা হেঁটে মসজিদেও যেতে পারি না। দেশের আনাচে-কানাচে ডিজিটাল উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও আমাদের গ্রামটি যেন আগের সেই আদিম অন্ধকার যুগেই পড়ে আছে।’

আক্ষেপের সুরে স্থানীয় বাসিন্দা মিজান মাতুব্বর বলেন, ‘মাদ্রা ও এর আশপাশের এলাকা যেন অবহেলার এক চরম নিদর্শন। পাশের সব ইউনিয়নের রাস্তাঘাট পাকা হয়ে গেলেও আমাদের এই সংযোগ সড়কটি আজও কাঁচা। আমাদের দাবি একটাই, দ্রুত সড়কটি পাকা করে আমাদের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করা হোক।’

অবকাঠামোগত এ জটিলতার বিষয়ে ঝাউদি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ মিন্টু হাওলাদার বাসস’কে বলেন, ‘আমি স্থানীয় মেম্বার হিসেবে সড়কটি সংস্কার ও পাকাকরণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছি। ইউপি সমন্বয় সভায়ও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি অর্থ বরাদ্দ বা কাজের চূড়ান্ত অনুমোদন আমরা পাইনি।’

বিষয়টি নিয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। তবে ওই সড়কটির সুনির্দিষ্ট সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের বিষয়ে আমাদের দপ্তরে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন বা অভিযোগ জমা পড়েনি। লিখিত প্রস্তাব পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বাসস’কে বলেন, ‘উপজেলার যেসব কাঁচা সড়ক জরুরি সংস্কার বা পাকাকরণ প্রয়োজন, সেগুলোর একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত হলে বরাদ্দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন করা হবে।’

এদিকে দীর্ঘদিনের এই অনাবিল ভোগান্তি ও দুর্দশা থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে তিন গ্রামের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এক হয়ে মাদারীপুর-৩ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছেও একটি যৌথ লিখিত আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। 

এলাকাবাসীর আকুল প্রত্যাশা, জনস্বার্থ, মানবিক বিবেচনা ও তিন গ্রামের মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট লাঘবে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত সড়কটি পাকাকরণের বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেবে। একটি টেকসই পাকা সড়ক শুধু তাদের চলাচলের সুবিধাই বাড়াবে না, বরং বাহের মাদ্রা, ব্রাহ্মন্দী ও আজিতুল্লাপাড়ার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ ও সামগ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটাবে।