বাসস
  ০১ জুলাই ২০২৬, ১৮:১২
আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৮:১৮

রংপুর অঞ্চলে বাণিজ্যিক কলা চাষে নীরব বিপ্লব

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রংপুর কৃষি অঞ্চলে বাণিজ্যিক কলাচাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। ছবি : বাসস

/ মো. মামুন ইসলাম /

রংপুর, ১ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : স্বল্প খরচে অধিক লাভের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রংপুর কৃষি অঞ্চলে বাণিজ্যিক কলাচাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এর মাধ্যমে অনেক কৃষক আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন।

উপযোগী মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া, বারবার বাম্পার ফলন এবং সন্তোষজনক বাজারমূল্যের কারণে এ অঞ্চলে কলা চাষ ইতোমধ্যেই অত্যন্ত লাভজনক ও জনপ্রিয় কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।

তবে যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কলা নষ্ট হচ্ছে, যা এ সম্ভাবনাময় খাতের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)’র তথ্য অনুযায়ী, রংপুর কৃষি অঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলাতেই কলার চাষ হয়।

এ অঞ্চলে সাগর, মালভোগ, চিনি চম্পা ও মেহের সাগরসহ বিভিন্ন জাতের কলার ব্যাপক আবাদ হচ্ছে।

স্বল্প পুঁজি ও কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক তরুণ ও শিক্ষিত উদ্যোক্তাও এখন কলা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

তবে সমস্যা দেখা দেয় ফসল সংগ্রহের পর। কলা দ্রুত নষ্ট হওয়া ফল হওয়ায় মাঠ থেকে সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারজাত করা না গেলে তা পচে যায়।

ডিএই সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ অঞ্চলের ৪ হাজার ২০৮ হেক্টর জমিতে কলা চাষ করে ১ লাখ ১২ হাজার ৩৫৭ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩৫৬ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত হয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ২২৭ মেট্রিক টন কলা।

আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৪ হাজার ৭৭ হেক্টর জমিতে চাষ করে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৬ মেট্রিক টন কলা উৎপাদন করেন কৃষকরা।

উৎপাদিত এসব কলা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয় রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ী হাট, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী হাট, ফাঁসিতলা হাট, রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বিভিন্ন বাজার এবং অন্যান্য স্থানে।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার টাকেয়া গ্রামের কৃষক হামিদুর রহমান, বকুল মিয়া ও আনোয়ার হোসেন জানান, গত কয়েক বছরে কলাচাষ করে তারা ভাগ্য বদলানোর সুযোগ পেয়েছেন।

তবে অধিক পরিমাণে কলা উৎপাদিত হলে কোল্ড স্টোরেজ বা বিশেষায়িত সংরক্ষণাগারের অভাবে বাধ্য হয়ে কম দামে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হয়।
কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘একটু দেরি হলেই কলা নষ্ট হতে শুরু করে। এতে প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া যায় না।’

বছরের বিভিন্ন মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে বাম্পার কলা উৎপাদন হলেও এখনো এ অঞ্চলে কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র বা বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ গড়ে ওঠেনি।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার পাইকানটারী গ্রামের কৃষক মাসুদুর রহমান, সাজু মিয়া ও হাবিবুর রহমান জানান, এক একর জমিতে কলাচাষে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়।

এক একর জমিতে প্রায় এক হাজারটি কলার চারা রোপণ করা যায়। ফলন ভালো হলে প্রতিটি কাঁদি ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়।

এতে এক একর জমি থেকে বছরে সাড়ে তিন লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।

রংপুর সদর উপজেলার কাঠিহারা গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী বলেন, কলার পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহার বিবেচনায় প্রতিটি বড় কলার হাটের পাশে কোল্ড স্টোরেজ বা বিশেষায়িত সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা উচিত।

তিনি বলেন, ‘এতে শুধু কৃষক ও ব্যবসায়ীরাই লাভবান হবেন না, ভোক্তারাও সারা বছর ন্যায্যমূল্যে রাসায়নিকমুক্ত ও টাটকা কলা পাবেন।’

এ বিষয়ে বাসসকে রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু বলেন, রংপুর অঞ্চলে আধুনিক কলা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তা জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণ, কলা সংরক্ষণের উপযোগী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কোল্ড স্টোরেজ, কলাভিত্তিক খাদ্যপণ্য উৎপাদনের কারখানা, আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক উপায়ে কলা পাকানোর প্রযুক্তি চালু করা প্রয়োজন।

রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বাসসকে জানান, প্রতিবছরই এ অঞ্চলে কলা চাষের পরিধি বাড়ছে।

তিনি বলেন, ডিএইর উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রমের ফলে কৃষকরা আত্মনির্ভরশীল হওয়া, নিজেদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কলা চাষ সম্প্রসারণ করছেন।